সোলারিয়া, আসিমভের এক কাল্পনিক গ্রহ

আইজাক আসিমভ যখন ফাউন্ডেশন সিরিজ লেখা শুরু করেন তখন তার সম্পাদক চেয়েছিলেন তিনি যেন দশক শেষ হওয়ার আগেই সিরিজের ছয়টি বই লিখে ফেলেন।
কিন্তু আসিমভ সাহেব ১৯৫৩ পর্যন্ত ফাউন্ডেশন ট্রিলজি লেখার পর বিরক্ত হয়ে লেখা ছেড়ে দেন। লেখক যেই সিরিজের উপর বিরক্ত হলেন সেই সিরিজকে কয়েক বছর পর ‘বেস্ট অল টাইম সিরিজ’ হিসেবে হুগো অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়।
পরে ভক্ত এবং প্রকাশকদের চাপে ১৯৮১ সালে লিখলেন “ফাউন্ডেশন এজ” দীর্ঘ ৩০ বছর পর।
আমি ঐসব ভক্তদের কথা চিন্তা করি যারা ট্রিলজি পড়েছিল ২০ বছর বয়সে, ৫০ বছর বয়সে তারা জানলো তাদের প্রিয় সিরিজের ৪র্থ খণ্ড বের হয়েছে। ১৯৮১ সালে সায়েন্স ফিকশন ভক্তদের কেমন অনুভূতি হয়েছিলো তা ২০১৫ সালে স্টার ওয়ার্স আসার পর বোঝা যায়।
” স্টার ওয়ার্স নিয়ে এত চিল্লাচিল্লি কেন?” এই ধরণের একটা প্রশ্নে নাফিসের একটা কমেন্ট কোট করি সিরিয়ালখোর থেকে।

“Its special for those people who grew up during 70’s or 80’s. They grew up watching it. They made sure their kids watched it when they were growing up.Generation to generation.
Its not how good of a space sci fi it is. Its more of a symbol of a generation. I have seen people almost crying once they heard the intro music when the first trailer of force awakens dropped.”

যেটার জন্য লেখা শুরু করলাম সেটাই এখন পর্যন্ত বলা হয় নাই, ফাউন্ডেশন সিরিজের কাহিনী ২০০০০ বছর পর মানবজাতির কাহিনী। তখন তারা মিল্কিওয়ে চষে বেড়াচ্ছে। বসবাস যোগ্য ২৫ মিলিয়ন গ্রহে তাদের আবাসন। এমনকি তাদের পূর্বপুরুষ যে পৃথিবী নামে একটা গ্রহ থেকে এসেছিল এটাও অনেকে বিশ্বাস করতে চাইতোনা।
তিন জনের একটা ছোটদল পৃথিবী খুঁজতে বের হয় (এখানে অনেক কাহিনী আছে)। পৃথিবীর চিহ্ন গ্যালাক্সির কোনও মানচিত্রে নাই, বা মুছে দেয়া হয়েছিলো। সন্ধানী দল অনেক সোলার সিস্টেমের গ্রহ খুঁজে তথ্য নেয়ার চেষ্টা করলো।
কোনও এক গ্রহ থেকে তারা জানতে পারলো পৃথিবী যেই সোলার সিস্টেমে আছে সেই সোলার সিস্টেমে দুইটা গ্যাস জায়ান্ট আছে। এবং পৃথিবীর বিশাল বড় একটা উপগ্রহ আছে। এসব তথ্য পাওয়ার পর তাদের কাছে মনে হয়েছিলো আসলেই পৃথিবী বলতে কিছু ছিলনা। কারণ একই সোলার সিস্টেমে দুইটা গ্যাস জায়ান্ট থাকা মানে সেখানে বসবাস যোগ্য গ্রহের সম্ভাবনা খুবই কম।
কিন্তু বায়োলজিক্যালই চিন্তা করলে একটা মাদার প্ল্যানেট থাকতেই হবে। দুই গ্রহে একই প্রজাতির প্রাণী একই রকম হতে পারেনা। তাদের বিবর্তন হবে ভিন্ন, হতে বাধ্য। তারা যখন শনির বলয় দেখতে পায় তখন আমার মনে হয়েছিলো ওদের গিয়ে বলি এটাই আমাদের সোলার সিস্টেম, তোমরা যেই গ্যাস জায়েন্ট এর কথা বলছ সেটার একটা এই শনি গ্রহ।
যাইহোক, আসল কথায় আসি। পৃথিবী খুঁজতে গিয়ে তারা এর আশেপাশের কয়েকটা সোলার সিস্টেমের গ্রহে যায় বা পৃথিবী ভেবে নামে ওইসব গ্রহে। এরা সবাই নিজেদের ওল্ড স্যাটেলার ভাবে। অবশ্য গ্যালাক্সির প্রায় সব গ্রহই এমনটাই ভাবে। আমরা যেমন ভাবি আমাদের সবার দেশই সেরা অনেকটা সেরকম।
এরকম একটা অদ্ভুত গ্রহ নিয়ে কথা বলি,

গ্রহটির নাম সোলারিয়া, একটা অধিকতর উজ্জ্বল নক্ষত্রের গ্রহ। এবং এই গ্রহটির নাম কিংবা অবস্থান গ্যালাক্টিক ম্যাপে নাই। শুধু গ্রহ না পুরো সোলার সিস্টেমই ম্যাপ থেকে গায়েব। সন্দেহ হয় কেন এটা লুকিয়ে আছে। হয়তোবা পৃথিবী সম্পর্কে তারা যা শুনেছিল তা বানানো কথা। দুইটা গ্যাস জায়ান্ট কিংবা একটা বড় উপগ্রহ এগুলা সব হয়তো বানানো কথা।

অনুসন্ধান করার জন্য তারা নেমে এসে সেই গ্রহে। সেখানে কি হয়েছে সেটা বলে স্পয়লার দিতে চাইনা কিন্তু এই গ্রহটা আমাকে বেশ আকর্ষণ করেছিল। আমার মনে হয়েছিল আমিও সম্পূর্ণ এরকম না হলেও এই গ্রহের মানুষের! মত জীবনযাপন করলে খারাপ হতোনা।
এই গ্রহে মাত্র ১২০০ জন পরিপূর্ণ মানুষের বসবাস। পরিপূর্ণ কি জন্য বললাম? এর কারণ সোলারিয়ানদের কাছে আমরা “হাফ হিউম্যান”। কারণ সোলারিয়ানরা নারীও না পুরুষও না তারা একসাথে দুটোই। যদিও একসময় তারাও ছিল হাফ হিউম্যান কিন্তু এখন তারা পূর্ণ।
এ ব্যাপারে একজন সোলারিয়ান এর কথা শোনা যাক,

“একসময় আমরাও ছিলাম অর্ধেক মানুষ। কোনও ব্যাপার না আমরা কিভাবে নিজেদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছি।, কিভাবে অসংখ্য রোবটের উপর কর্তৃত্ব বিস্তার করেছি সেটাও কোনও ব্যাপার না; পুরপুরি স্বাধীনতা ছিল না। সন্তান তৈরির
জন্য আলাদা দুজনকে একত্রিত হতে হত। অবশ্য কৃতিমভাবে ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মিশ্রণ দ্বারা সন্তান উৎপাদন করে রোবটের সাহায্যে লালনপালন সম্ভব ছিল সেই ব্যবস্থাই করা হয়েছিলো, কিন্তু অর্ধেক মানুষেরা শারীরিক সংস্পর্শের আনন্দ ছাড়তে পারল না। বিকৃত আবেগের কারণে বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছিল ব্যাক্তি স্বাধীনতা।”

তাদের মতে মানবজাতি প্রকৃত স্বাধীনতা কি সেটা জানেনা। তারা সবসময় বাস করেছে দলে দলে। আমাদের অন্যকিছু জানা ছিলনা, বাঁচার জন্য এটাই ছিল আমাদের একমাত্র উপায়। কিন্তু দল বেঁধে থাকা মানেই অন্যের ইচ্ছার কাছে নিজের ইচ্ছাকে পদানত করা বা নিজের ইচ্ছার কাছে অন্যের
ইচ্ছাকে পদানত করা। সোলারিয়ানরা এভাবে স্বাধীনতা খুঁজে পায়না, তাদের কাছে স্বাধীনতা মানে নিজের ইচ্ছামতো বাস করার অধিকার। ঠিক নিজের ইচ্ছেমতও। সে কারণে তারা গ্যালাক্সির বাকি গ্রহদের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় এবং আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যায় এবং সার্ফেস রক্ষার জন্য উপযুক্ত রোবট এবং অস্ত্র তৈরি করে। যার ফলে কিছুদিন পর আগন্তুকরা আসা বন্ধ করে দেয়।
ঠিক যেমনটা চেয়েছিল তারা।
খুব সতর্ক এবং সূক্ষ্মভাবে নিজেদের জিন পরিবর্তন শুরু করে তারা, সাফল্যের পরিমাণ ছিল খুব সামান্য। কিন্তু সেটা নিয়েই তারা এগিয়ে চলে। বহু শতাব্দীর প্রচেষ্টার পর তারা সফল হয় নিজেদের স্বয়ংসম্পূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে, একই শরীরে পুরুষ এবং নারীর বৈশিষ্ট্য। ফলে ইচ্ছানুযায়ী উপভোগ এবং যখন চায় তখন সন্তান উৎপাদনের জন্য ডিম্বাণু নিষিক্ত করতে পারে।
এই পদ্ধতিকে বলা হয় “হারমাফ্রোডাইটস”। হারমাফ্রোডিটিজম বিবর্তন প্রক্রিয়া থামিয়ে দেয়, কারণ প্রতিটা শিশুই তার পিতামাতার জেনেটিক প্রতিরূপ।
তারা নিজেদের হিউম্যান বিং বলা বাদ দিয়ে দিয়েছে কারণ হাফ হিউম্যানরা নিজেদের এই নামে আখ্যায়িত করে। নিজেদেরকে তারা হোল হিউম্যান বিং বলতে পারে কিন্তু সেটা হাস্যকর শোনায় বলে নিজেদেরকে “সোলারিয়ান” বলে।
তাদের হিসেব করে জন্ম এবং মৃত্যু হয়, বাচ্চা বেশী হলে তাদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করবে। তাদের যখন মনে হয় অনেক হয়েছে এবার মরে যাই তখন তারা একজন বাচ্চা নেয়।

এই গ্রহের জিনিষগুলা হাস্যকর শোনালেও ২৫ মিলিয়ন গ্রহে মানুষের বসবাস। কেউ কেউ নিজেদের আলাদা করে রাখতেই পারে। এবং ভাল ব্যাপার হলও তারা এইটা প্রমোট করছেনা বরং নিজেদের মাঝেই সীমাবদ্ধ রেখেছে।

আমার কাছে কেন যেন মনে হয় এরকম একটা গ্রহে থাকলে পারলে খারাপ হতোনা বরং ভালোই লাগতো হয়তবা।

১,৪২১ বার দেখা হয়েছে

৫ টি মন্তব্য : “সোলারিয়া, আসিমভের এক কাল্পনিক গ্রহ”

    • নাজমুল (০২-০৮)

      ধন্যবাদ মোস্তাফিজ ভাই। আমি নিজে বাংলায় পড়েছি, ৭ নাম্বার বই এর কিছু পৃষ্ঠা মিসিং ছিল তাছাড়া বলবো অনুবাদ থেকে সবকিছু খুব সুন্দর করে করা।

      আমার কাছে ইবুক হিসেবে আছে, কিন্তু সম্ভব হলে কিনে পড়তে পারেন। সম্ভব না হলে ইমেইল এড্রেস্টা কষ্ট করে দিবেন আমি পাঠাই দিব।

      জবাব দিন
  1. মইনুল (১৯৯২-১৯৯৮)

    অসাধারন একটা সিরিজ। দ্য কেভস অফ স্টিল, দ্য নেকেড সান, দ্য রোবটস অফ ডওন আর রোবটস অ্যান্ড এম্পায়ার - এই চার বইএর সিরিজ টাও দারুন। আমি আশা করেছিলাম এম্পায়ারের সুচনা পর্ব নিয়ে বা গায়ার সিদ্ধান্তের পরের কোনো গল্প খুজে পাবো। কিন্তু আসিমভ তো না ই, অন্য কেউই ওই সময়গুলো নিয়ে লিখেনি।

    জবাব দিন

মওন্তব্য করুন : নিলয়

জবাব দিতে না চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।