“হরতাল”-একটি সামাজিক উৎসব

সূচনাঃ হরতাল একটি সর্বধর্মীয় সার্বজনীন সামাজিক অনুষ্ঠান। এটি সাধারণত প্রধান বিরোধীদলের দলীয় স্বার্থ রক্ষার্থে পালন করা হয়। আমাদের দেশে সাধারণত নির্বাচনের আড়াই থেকে তিন বছর পর থেকে বিরোধী দল কারণে অকারণে হরতাল ঘোষণা করে জনগণের জন্য এক্সট্রা ছুটি ও অবসরের আয়োজন করে।

প্রকৃতিঃ হরতাল সবসময়ই বিরোধী দল কর্তৃক ডাকা হয়। এই দিনে রাস্তায় প্রচুর পুলিশ, র‍্যাব, ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের কর্মী দেখা যায়। রাস্তায় রাস্তায় হয় পিকেটার অথবা পুলিশ ব্যারিকেড থাকে। কেউ রাস্তায় বের হলে যে কোন এক পার্টি আর ভাগ্য বেশী ভাল হলে দুই পার্টি অর্থাৎ পুলিশ এবং পিকেটার উভয়ের সাথে কুশল বিনিময়ের সুযোগ পেয়ে যায়। গলিতে, পাড়ার রাস্তায় বালকেরা ফুটবল- ক্রিকেট খেলায় মেতে ওঠে। চারিদিকে ছুটির আমেজ দেখা যায়।

হরতালের প্রস্তুতি: হরতালের প্রস্তুতি অনেক ঘটা করে অনুষ্ঠিত হয়। হরতালের ঘোষণা আসার পর প্রতিটা টিভি চ্যানেলের নিচের স্ক্রলে ব্রেকিং নিউজে প্রচার শুরু হয়। পূর্ববর্তী দিনের সন্ধায় কোথাও কোথাও মিছিল অনুষ্ঠিত হয় হরতালের পক্ষে ও বিপক্ষে। এই দুই দলের ভিতর ছোঁয়াছুঁয়ি,চোর-পুলিশ, বরফ-পানি টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হয় রাস্তার মাঝখানে। পুলিশ সেখানে রেফারীর দায়িত্ব পালন করে। এবং সবসময়ই পুলিশ সরকারী দলের প্রতি পক্ষপাত দুষ্ট হওয়ায় খেলার সঠিক ফলাফল পাওয়া যায় না। আনন্দের অতিসাহ্যে দু-একটি বাসে আগুন দেয়ার ঘটনাও ঘটে। কখনো কখনো একটু উন্নত মানের পটকাবাজীরও ব্যবস্থা করা হয়।

অপকারীতাঃ হরতালের দিনে রাস্তায় সুন্দর মেয়েদের দেখা যায় না। প্রেমিকেরা এই দিনে রাস্তায়,পার্কে প্রেম করতে পারে না। যেহেতু বাসা থেকে বের হওয়ার উছিলা থাকে না তাই সারাদিন উঠতি বয়সের ছেলেদের সিগারেট খাওয়ার জন্য অনেক কষ্ট করতে হয়। ভাল রেস্ট্রুরেন্ট গুলো বন্ধ থাকায় পচা হোটেলের খাবার খেতে হয় ব্যাচেলরদের। এগুলা ছাড়া হরতালের তেমন কনো অপকারিতা নাই।

উপকারীতাঃ হরতালের উপকারিতার শেষ নাই। ব্যস্ত মানুষের জীবনে হরতাল এনে দেয় অবসরের সুযোগ। গতবাধা সরকারী ক্যালেন্ডারের লাল তারিখগুলোর সাথে যোগ হয় কিছু বোনাস ছুটি। পরিবেশ দুষন রোধে বড় ভুমিকা রাখে হরতাল। রাস্তায় জ্যাম থাকে না। আমরা ছোট বেলায় পড়েছি অর্থই সকল অনর্থের মূল। আর যেহেতু হরতাল অর্থনীতি স্থবির করে দেয়, তাই অনর্থ কম হয়। কিছু পুরাতন,ফিটনেসহীন, রাস্তায় চলার অযোগ্য বাস,গাড়ি পুড়িয়ে শেষ করা যায়। দুই-চার জন মানুষ মরে আমাদের দেশের জনসংখ্যার চাপ কিছুটা কমায়। স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় বাচ্চারা বাসায় নিজেদের পড়ালেখার প্রস্তুত করার সুযোগ পায়। সারামাসের জমে থাকা সিনেমা গুলো দেখে শেষ করা যায় এইদিনে।  যেহেতু মেয়েরা শপিং এ যেতে পারে না এই দিনে, তাই পরিবারের বেশকিছু টাকাও সঞ্চিত হয় হরতাল উপলক্ষে। আর বেশী সৌভাগ্যবান হলে আপনার জন্মদিন বা বিবাহবার্ষিকীতে পড়তে পারে হরতাল। পড়লে বাঁচাতে পারেন বেশ কিছু টাকা (ফাউ বন্ধু বান্ধব দেড়শ টাকার বডিস্প্রে বা সবচেয়ে ছোট সাইজ আফটার শেভ ১০টাকার র‍্যাপিং পেপারে মুড়িয়ে অথবা এক প্যাকেট সিগারেট যা থেকে যাওয়ার যাওয়ার আগ পর্যন্ত ৮/১০টা নিজেই কোপাইয়া দিয়ে, কোপ্তা কালিয়া খেয়ে যেতে পারবে না।)। আবার নিম্ন আয়ের মানুষেরা যেমন রিক্সাওয়ালা, সিএনজি ড্রাইভার, সব্জি বিক্রেতা এরা ভাড়া বা দাম ২/৩ গুন বাড়িয়ে বাড়তি আয়ের পথ দেখে।

সুপারিশঃ যারা হরতাল করেন তাদের কাছে কিছু সুপারিশ। হরতালের দিন  এমুজমেন্টপার্ক,সিনেমা হল সহ বিনোদনের জায়গা গুলা হরতাল আওতামুক্ত রাখা রাখা উচিত। যাতে করে মানুষজন অবসর সময়টা ভাল কাটাতে পারে। আর যেহেতু বাংলাদেশের বেশীর ভাগ মানুষ গ্রামে থাকে তাই গ্রামগুলোকেও হরতালের আওতায় আনা হোক। গ্রামের মানুষ পায়ে হেঁটে চলাফেরা করে বেশী, সেখানে রাস্তায় কাঁটা বিছিয়ে পিকেটিং করা যেতে পারে।

উপসংহারঃ সবশেষে বলতে চাই হরতালের মত এত সুন্দর ও সামাজিক অনুষ্ঠানে দলমত নির্বিশেষে সকলের অংশ গ্রহন করা উচিত। এবং সরকারী দলেরও উচিত মাঝে মাঝে হরতাল করে জনগণেরর আনন্দের ব্যবস্থা করা।

৭৯৭ বার দেখা হয়েছে

৪ টি মন্তব্য : ““হরতাল”-একটি সামাজিক উৎসব”

মওন্তব্য করুন : আসিফ খান (১৯৯৪-২০০০)

জবাব দিতে না চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।