আমার দেখা স্বর্গপুরি – ২

আমার দেখা স্বর্গপুরি – ১

খুব ভোরে প্যারিসে পৌঁছালাম। সকাল ৮ টা। ইন্টারন্যাশনাল বাস টার্মিনালের অপেক্ষাগারে ক্লান্ত ও বিধ্বস্ত হয়ে বসে বসে ঠিক করে নিচ্ছি আজকের দিনের পরিকল্পনা। কোথায় আস্তানা গাড়বো সেটা নিয়ে আলোচনা চলছে আর এর মাঝেই এক আগন্তুকের আবির্ভাব। আগন্তুক আমাদেরকে তার বাসায় পেইং গেষ্ট হিসাবে থাকার প্রস্তাব করলো। প্রতিদিন ২০ ইউরো দিতে হবে বিনিময়ে থাকা এবং খাওয়া। ফ্রড হতে পারে এইকথা মাথায় থাকার পরও কেমন করে যেন আমরা রাজি হয়ে গেলাম। হয়তো লোকটার কোন সম্মোহনি ক্ষমতা ছিল আথবা আমরা এতই ক্লান্ত ছিলাম যে সিদ্ধান্ত নেবার মানসিক শক্তি আমাদের ছিল না। ভয়ে ভয়ে আমরা আগন্তুকের সাথে চললাম তার বাসার উদ্দেশ্যে। আগন্তুকের নাম চনো, কোরিয়ান নাগরিক। তার বাসায় পৌঁছার পর দেখলাম হুলুস্তুল ব্যাপার। এটা তাদের পারিবারিক ব্যবসা। বাসায় দুটা রুম আলাদা করে রাখা হয়ে টুরিস্টদের জন্য। প্রতি রুমে ৬ জনের থাকার ব্যবস্থা। চনো আর তার ভাই বাস টার্মিলান এবং ট্রেন স্টেশন থেকে টুরিস্ট সংগ্রহ করে নিয়ে আসে আর পরিবারের সবাই মিলে আদের আদর আপ্যায়ন করে। বাসার পরিবেশ দেখে আমাদের বেশ শান্তি শান্তি অনুভুতি হল। আমরা প্রথম যে কাজটা করলাম তা হল আয়েশ করে একটা ঘুম দিয়ে নিলাম। আমরা প্যারিসে ছিলাম চার দিন। এই চারদিন আমরা অনেক মজা করেছি। কোরিয়ান এই পরিবারটির সাথে বেশ ভাল বন্ধুত্ব করে ফেলেছি। ওরা আমাদেরকে চপ স্টিক দিয়ে খাওয়া শেখালো, ওদের কাছে আমরা প্রতিদিন রাতে কোরিয়ান ভাষা শিখতাম। অনেক অনেক মজা করেছি আমরা।

কোরিয়ান পরিবারটির সাথে আমি আর তৌহিদ

কোরিয়ান পরিবারটির সাথে আমি আর তৌহিদ


অপেরা হাউজের সমনে চনো'র সাথে আমি আর তৌহিদ

অপেরা হাউজের সমনে চনো'র সাথে আমি আর তৌহিদ

প্রথমদিন দুপুরে খেয়ে দেয়ে আমরা বের হলাম অন্নদাশংকরের “পারী” নগরী দেখতে। আসলেই ছবির মত একটা শহর। বিশাল বিশাল রাস্তাগুলো দেখে আমার প্রথমেই মনে হয়েছিল ছোট্টবেলায় পড়া ‘পারী’ গল্পটার কথা। শহরের যেকোন প্রান্ত থেকেই দেখা যায় পৃথিবী সপ্তাশ্চার্যের একটি আশ্চার্য সৃস্টি ‘আইফেল টাওয়ার’। বিশ্বাস করুন আর নাই করুন আমরা জেনারেল লাইন অব ডিরেকশন ধরে হাটতে হাটতে পৌঁছে গেলাম আইফেল টাওয়ারে। যেতে যেতে শহরও দেখা হল আবার যাতায়াত খরচটাও বেঁচে গেল। টাওয়ারের সর্বোচ্চ বিন্দুতে উঠে মনে হলো যেন বিশ্বজয় করে ফেলেছি। সেই অনুভুতি বর্ণনা করার মত ভাষা আমার জানা নেই।

আইফেল টাওয়ারের সামনে...

আইফেল টাওয়ারের সামনে...


আইফেল টাওয়ারের উপর থেকে

আইফেল টাওয়ারের উপর থেকে

পরদিন দেখতে গেলাম লুভর মিউজিয়াম। লুভর যে এত বড় যাদুঘর তা আমি স্বপ্নেও কল্পনা করিনি। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর প্রবেশ করলাম যাদুঘরের ভিতরে। চারিদিকে এত সুন্দর সুন্দর শিল্পকর্ম দেখে আমরা নির্বাক হয়ে গেলাম। ম্যাপ হাতে নিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখছি আর দেখে ফেলা অংশটুকু কেটে দিচ্ছি। একসময় আমাদের গন্তব্য ‘মোনালিসা’র নিকট পৌঁছে গেলাম। মোনালিসাকে ছুঁয়ে ফেলার দূরত্ব থেকে দেখতে পারার যে অনুভুতি তা বর্ণনা করার সামর্থ্য কি আমার আছে? ৭-৮ ঘন্টা ধরে দেখার পরও মনে হয় শেষ করতে পারলাম না লুভর দর্শন। শুধুই ভাল লাগা আর ভাল লাগা নিয়ে বের হলাম।

দ্যা লুভর

দ্যা লুভর


লুভরে সংরক্ষিত অরিজিনাল মোনালিসা

লুভরে সংরক্ষিত অরিজিনাল মোনালিসা


লুভরেরে ভিতরে...

লুভরেরে ভিতরে...


এসো প্রনাম করি

এসো প্রনাম করি


আকর্ষনীয় শিল্পকর্ম

আকর্ষনীয় শিল্পকর্ম

তৃতীয়দিন সকাল ৮ টা থেকে রাত ৯ টা পর্যন্ত পুরাটায় পার করলাম ‘ওয়াট ডিজনি ল্যান্ড’ এবং ‘ডিজনি স্টুডিও’তে। তারপরও সবগুলো রাইডে চড়তে পেরেছি কিনা আমার সন্দেহ আছে। যে প্যারিস ঘুরে এসেছে কিন্তু ডিজনি ল্যান্ডে যায়নি তার প্যারিস ভ্রমনই বৃথা। সবগুলো রাইডের কথা এখন আমার মনে নেই কিন্তু সেই অনুভুতিগুলো এখনো স্মৃতি ভেসে বেড়ায়। ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর সব রাইড আর অভূতপূর্ব সব সৃস্টি শুধু মুগ্ধই করেনি সাথে দিয়েছে নির্মল আনন্দ যা আমি সারাজীবন বয়ে নিয়ে যেতে পারবো। ডিজনি স্টু্ডিও কোন অংশে ডিজনি ল্যান্ডের চেয়ে কম নয়। এই স্টুডিওর ভেতরেই তৈরী করা আছে পৃথিবীর বিখ্যাত বিখ্যাত সব শহর এবং যেখান থেকে ঐসব শহরের সব শ্যুটিং করা সম্ভব। এত সুন্দর ব্যাবস্থাপনা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।

ডিজনি ল্যান্ড

ডিজনি ল্যান্ড


ডিজনি স্টুডিও

ডিজনি স্টুডিও


ডিজনি স্টুডিও'র মধ্যে মাস্তি

ডিজনি স্টুডিও'র মধ্যে মাস্তি

প্যারিস দর্শনের শেষদিনে আরো কিছু ছোট বড় যাদুঘর দেখলাম। এর মধ্যে অপেরা হাউজ, নটরডেম বিল্ডিং, ন্যাশনাল মিউজিয়াম, প্যারিস গেট উল্লেখযোগ্য।

নটরডেম বিল্ডিং

নটরডেম বিল্ডিং


প্যারিস গেট

প্যারিস গেট

প্যারিস দর্শনের মাধ্যমে আমাদের প্রথম পর্বের ইউরোপ ভ্রমন শেষ করতে হলো। চতুর্থদিন রাতের বাসে আমরা রওনা হলাম লন্ডন অভিমুখে। সারারাত বাসের মধ্যে ঘুমালাম। সকালে লন্ডন পৌঁছে গেলাম। বুকের মধ্যে কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা অনুভব করলাম, মনটা খারাপ হয়ে গেল। আর মাত্র দুইদিন পরেই সেকেন্ড টার্মের ট্রেনিং এর জন্য একাডেমিতে যোগদান করতে হবে। ভয় লাগছে, সবাই দোয়া করেন… (সময়টা ছিল এপ্রিল ২০০৪)

২,২৭১ বার দেখা হয়েছে

২৮ টি মন্তব্য : “আমার দেখা স্বর্গপুরি – ২”

  1. মাসরুফ (১৯৯৭-২০০৩)

    মনে হচ্ছিল চোখের সামনে সব দেখতে পাচ্ছি!!
    ওফ টপিক-ইয়ে মেহেদী ভাই,ফরাসী তন্বীদের দিয়ে দুয়েক ছত্র লেখা যায়না? উনাদের কত সুনাম শুনেছি দাদা :shy: :shy:

    জবাব দিন
  2. মাসরুফ (১৯৯৭-২০০৩)

    ইয়ে বস,একটা টাইপো আছে মনে হয় 🙁 এইডা তো মনে হইতেছে নটডেম বিল্ডিং-ঐ যে হাঞ্চব্যাক অফ নটরডেমের 🙁 একটু খিয়াল কৈরা দেইখেন আর আমার কমেন্ট মুইছা দিয়েন 🙁

    জবাব দিন
  3. ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)

    প্যারিস .... ;)) ;))
    প্যারিস গেটের পাশ দিয়ে লুভর পর্যন্ত যে রাস্তাটা চলে গেছে তার নাম বোধহয় Champs Elysee। অনেক সিনেমাতে এই রাস্তাটাকে দেখিয়েছে। এই রাস্তাটার উপর দিয়ে কি হেটে গেছ না টুরিস্ট বাসে ছিলে?


    “Happiness is when what you think, what you say, and what you do are in harmony.”
    ― Mahatma Gandhi

    জবাব দিন
    • মেহেদী হাসান (১৯৯৬-২০০২)

      অসম্ভব সুন্দর একটা ডাউট, আপনাকে ধন্যবাদ।

      আসলে ওদের কাজই ছিল ট্যুরিস্টদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করা, তাই এইদিকটা নিয়ে ওরা অনেক সচেতন ছিল, আমাদের তেমন কোন সমস্যা হয়নি......
      আর রয়েল মিলিটারী একাডেমিতে এক বছরে যে আমি কি কি খেয়েছি তার কোন ঠিক ঠিকানা নেই... সেই সব কথা মনে না করাই ভাল, ঐ সময়টাতে মনে হয় আমি সর্বভুক হয়ে গেয়েছিলাম... হা হা হা হা...

      জবাব দিন

মওন্তব্য করুন : মেহেদী হাসান (১৯৯৬-২০০২)

জবাব দিতে না চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।