বইটির নাম ”Bookie Gambler Fixer Spy” ২য় পর্ব

এড হকিন্স এর লেখা Bookie Gambler Fixer Spy বইটির দুইটি অধ্যায় আমার পরিচিত ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য অনুবাদ শুরু করেছি। ঠিক অনুবাদ নয়, ভাবানুবাদ। আকারে বেশি বড় হয়ে যাবার কারণে কিছু অনুচ্ছেদ আমি বাদ দিয়েছি।

যাই হোক, আজ সেটার দ্বিতীয় কিস্তি শেয়ার করছি। মনে রাখবেন স্পয়লার এলার্ট কিন্তু আগেই দিয়ে রাখছি। নিজ দায়িত্বে পড়বেন। কারণ ‘It will change the way you look at cricket!’

———–
প্রথম পর্বঃ
———–

আকসু’র প্রথম প্রধান লর্ড কনডন এর মতে টি-২০ ক্রিকেট, বিশেষ করে আইপিএল এর কারণে ক্রিকেটে নতুন করে দুর্নীতি ঢুকেছে। ২০০৯ সালে তিনি বলেছিলেন এই পিকনিক ফরম্যাটটির কারণে গত দশ বছর তারা ক্রিকেটকে স্বচ্ছ রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন! সস্তা বিনোদন, ক্রিকেট, তারকাদের মেলা, পার্টি মনোভাব- দুর্নীতির আখড়া বানাবার দারুণ কম্বিনেশন! তিনি যে কথাটি বলেন নি তা হল ফ্রাঞ্চাইজি সিস্টেমের কারণে টি-২০ ক্রিকেটারদের এখন আর কোন নির্দিষ্ট দলের প্রতি আনুগত্য নেই, তারা ভাড়াটে সৈন্যের মত হয়ে গেছে। ফলে, তাদেরকে দিয়ে এমন অনেক কিছুই করানো সম্ভব যা আগে হয়ত ভাবাই যেত না।

এ ব্যাপারে আমি মাইকেল হোল্ডিং এর সাথে কথা বলেছিলাম। আমার আশা ছিল তিনি তুড়ি দিয়ে আমার সব আশংকা উড়িয়ে দেবেন। উলটো তিনি সরাসরি স্বীকার করে বললেন আসলে দুর্নীতি কখনোই পুরোপুরি নির্মূল হয় নি। ‘ক্রিকেটের সাথে এখন এত টাকা জড়িত যে ধান্ধাবাজ লোকজন আসবেই। আমি জানি না আকসু’র লোকজন কী করছে, ওদের তো ফাইভ স্টার হোটেলে আরাম-আয়েশ করা আর বিজনেস ক্লাসে প্লেনে করে দেশ-বিদেশ ভ্রমণ ছাড়া তেমন কিছু করতে দেখি না। তিক্ত সত্য হচ্ছে দুর্নীতিবাজদের ঠেকাবার মত কেউ নেই!’

যাই হোক, সে বছর ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ টি-২০ চলাকালীন আকসু’র একজন শীর্ষ কর্মকর্তার সাথে দেখা করার সুযোগ পাই। আইপিএল এর ফিক্সিং নিয়ে আমার আশঙ্কা এবং টসের ব্যাপারে আমার কিছু জানা তথ্য তাকে জানাই। কিন্তু তিনি আমাকে নিশ্চিতভাবে কিছুই জানাতে পারলেন না। উলটো পরস্পর বিরোধী কথা বলে আমাকে আরও দ্বিধায় ফেলে দিলেন। একবার বললেন ‘…আসলে বুকিদের খপ্পরে পড়লে খেলোয়াড়রা আর বের হয়ে আসতে পারে না, ওরা অনেক ভয়ংকর…হুমকি দিতেও পিছপা হয় না!’ পর মুহূর্তেই জানালেন ‘এবারের বিশ্বকাপ হবে সবচেয়ে স্বচ্ছ। এ ব্যাপারে আমরা যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী।‘ কথায় কথায় আবার জানালেন ‘৮০ ও ‘৯০ এর দশকেও উপমহাদেশের প্রতি তিনটি আন্তর্জাতিক ম্যাচের একটি ফিক্সড ছিল! শেষ তথ্যটি আমি নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করেছি। এটি ছাড়া আমি বুঝতে পারছিলাম না তার কোন কথাটি বিশ্বাস করবো। সবচেয়ে বিপদে পড়লাম যখন তিনিই উলটো আমার কাছে জানতে চাইলেন ম্যাচ ফিক্সিং এর ব্যাপারে ব্রিটিশ বুকিদের (তিনি জানতেন ওদের সাথে আমার ভালো যোগাযোগ রয়েছে) কাছে কোন তথ্য আছে কী না! ‘আপনি কী খোঁজ নিয়ে কোন খেলোয়াড়ের নাম বের করতে পারবেন?’

২০০৯ সালের শুরুতেও ম্যাচ ফিক্সিং এর ব্যাপারে মিডিয়ায় তেমন কথা শোনা যায় নি। জুলাই মাসে এসেজ সিরিজের মাঝে ঘটা এক ঘটনায় এই টপিক আবার হালে পানি পায়। শোনা যায় লর্ডস টেস্ট চলাকালীন কেনসিংটন রয়েল গার্ডেন হোটেলে এক লোক অসি খেলোয়াড়দের ম্যাচ ফিক্সিং এর প্রস্তাব দিয়েছিল। সে আবার একজন সুপরিচিত অবৈধ বুকমেকারের সাথে সম্পৃক্ত। সেই বুকমেকার পরে হলফ করে বলেছিলেন যে লোক অসি খেলোয়াড়দের সাথে কথা বলেছিল সে আসলে তার বাবা। মদ পান করে নেশার ঘোরে উলটাপালটা কথা বলেছিল। এই ঘটনা বেশি দূর না গড়ালেও এর কিছুদিন পর ক্রিকেট দুনিয়া পুনরায় তোলপাড় করা ঘটনাটি ঘটল। নিউজ অব দ্যা ওয়ার্ল্ড পাকিস্তানি সালমান বাট, মোহাম্মদ আসিফ ও মোহাম্মদ আমিরের নো বল সংক্রান্ত ফিক্সিং এর ঘটনা ফাঁস করে দিল।

সোশ্যাল মিডিয়া থেকে ভেতরের আরও কোন খবর পাওয়া যায় কী না এই আশায় আমি টুইটারের শরণাপন্ন হলাম। ফলোয়ারদের কেউ আমাকে ভারতীয় বুকির সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে পারবে কী না জানতে চাইলাম। সবার প্রথম সাড়াটি এলো পার্থিব এর কাছ থেকেঃ ‘I work for a bookie … I thought I told u. U wanna fix a match?’

কিছুক্ষণ পর জামালও মেসেজ পাঠাল। ‘I BIG BOOKIE HERE IN DELHI. TELL ME WHAT U NEED MAN.’ এবং সবশেষে বিনয় লিখল-‘We can’t talk on here but email me and I explain everything for you.’ অন্য আরেকজন আমাকে দুবাই এর এক বুকির নাম্বার দিয়ে যোগাযোগ করতে বলল। কিন্তু সেই নম্বরে ফোন করার পর ফোন রিসিভকর্তা জানালো যে সে ব্যাপারে কোন কথা বলতে রাজি নয়। এসবের বাইরে আরও কয়েকটি মেসেজ পেলাম, কিন্তু তাদের থেকে আর কোন সাড়া পাই নি।

সত্যি কথা বলতে জামালের কথায় আমার কখনোই তেমন কোন ভরসা হত না। ওকে যদি জিজ্ঞাসা করতাম ‘তুমি কোন মহাকাশচারীকে চেন কী না? আমি নিশ্চিত এর জবাবে ও লিখতঃ ‘I BIG ASTRONAUT HERE IN DELHI. TELL ME WHAT U NEED MAN.’ সেজন্য আমি পার্থিব এবং বিনয়কে ওর ব্যাপারে প্রশ্ন করলাম। ওরা আমার আশঙ্কাকে নিশ্চিত করে বলল জামাল সত্যিকারের বুকি নয়। ‘আমি ওকে ব্লক করে রেখেছি’, পার্থিব জানালো। আর বিনয় বলল, ‘ওর থেকে দূরে থাকো, ব্যাটা সুবিধের না!’

অর্থাৎ হারাধনের দুই ছেলের মত শেষ পর্যন্ত রইল পার্থিব এবং বিনয়। ওদের সাথে আমার এক ধরণের অব্যক্ত, অলিখিত চুক্তি হয়ে গেল। মানে, বুকমেকিং ইন্ডাস্ট্রি কিভাবে কাজ করে সে ব্যাপারে ওরা আমার সকল প্রশ্নের জবাব দেবে বিনিময়ে আমি ওদেরকে আসন্ন বিশ্বকাপ,বিশ্বকাপের পর ভারতের ইংল্যান্ড সফর, যেখানে তারা ৪ টেস্ট, ৫ ওয়ানডে এবং ১টি টি-২০ ম্যাচ খেলবে- পুরো সফরের পরিসংখ্যানগত প্রিভিউ, পিচ ডেটা (ইনিংস গড় রান, টসের পরিসংখ্যান) এবং আবহাওয়ার রিপোর্ট জানাবো।

ততদিনে আমি বুঝে গেছি ভারতীয় কারও সাথে লেনদেনের সম্পর্ক না করলে কিছু পাওয়া যাবে না। অর্থাৎ, কিছু পেতে গেলে কিছু দিতে হবেই। তবে, ওদের আগ্রহ পরিসংখ্যানের চেয়ে অন্য ব্যাপারে বেশি ছিল। পার্থিব চাইত আমি যেন আমার টুইটার একাউন্ট ব্যবহার করে ওদের জন্য গ্রাহক যোগার করে দিই, বিনিময়ে সে আমাকে কমিশন দেয়ার প্রস্তাব করেছিল। এই ব্যাপারে আমার কোন আগ্রহ না থাকলেও সরাসরি না-ও বলিনি। এটা ওটা বলে এই আলোচনা উপেক্ষা করতাম।

ওদিকে বিনয়েরও নিজস্ব কিছু ‘বিজনেস প্ল্যান’ ছিল। ও প্রস্তাব দিল আমি যেন ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ম্যাচগুলোয় ওয়েব ক্যাম ব্যবহার করে সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থা করি। এরপর সে ভারতের সকল বুকমেকারকে টাকার বিনিময়ে ঐ ভিডিও ফিড দেখানোর ব্যবস্থা করবে। ‘তুমি আমার লোকাল এজেন্ট হিসেবে থাকবে!’ ওর ক্ষেত্রেও আমি ধীরে চলো নীতি ব্যবহার করে আলোচনা পিছিয়ে দিতাম। পাশাপাশি এটাও বোঝাবার চেষ্টা করতাম ইংল্যান্ডে ওসব করা সম্পূর্ণ বেআইনি। লাইন্সেন্স ছাড়া সম্প্রচার করা সম্ভব নয়। তাছাড়া ইসিবি আমাকে কখন লাইসেন্স দেবেও না। জবাবে বিনয়ের সহজ সমাধান-‘আরে! ঘুষ দিবা!’

ওকে কী করে বোঝাই ভারতের মত ইংল্যান্ডে কথায় কথায় ঘুষ দিয়ে কাজ আদায় করে নেয়াটা শুধু কঠিনই নয়, প্রায় অসম্ভব!
(চলবে)

২ টি মন্তব্য : “বইটির নাম ”Bookie Gambler Fixer Spy” ২য় পর্ব”

মওন্তব্য করুন : জুনায়েদ কবীর (৯৫-০১)

জবাব দিতে না চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।