ওয়েস্টার্নঃ ঠান্ডা প্রতিশোধ! ৫ম পর্ব

পর্ব

৯।

পরদিন একটু বেলা করেই আর্থারের বাড়িতে গেল ন্যাশ। বাড়িটা দিনের আলোয় ভাল করে দেখতে পেল। ছোট-খাট হওয়া স্বত্তেও সুন্দর করে সাজানো। সামনে ছোট্ট একটি ফুলের বাগান, দেখেই বোঝা যায় নিয়মিত যত্ন নেয়া হয়। দরজা নক করার কিছুক্ষণ পরই দরজা খুললো র‍্যাচেল। ন্যাশ ওকে দেখেই চিনতে পারল-কেননা ও দেখতে প্রায় ওর মা এর মতনই হয়েছে, তবে আরো বেশি সুন্দরী। আরেকটা পার্থক্য হচ্ছে মা এর মধ্যে কমনীয় ভাবটা প্রবল হলেও মেয়ের চেহারায় এক ধরনের কাঠিন্য রয়েছে। তবে এই মুহুর্তে রেগে আছে বলেও সেটা হতে পারে, কেননা নাক-মুখ লাল হয়ে আছে এবং নিঃশ্বাস নেবার সাথে সাথে নাকের ফুলকোগুলো জোরে ওঠা-নামা করছে।
-কি চাই? ঝাঁঝের সাথে জিজ্ঞাসা করল র‍্যাচেল।
-গুড মর্নিং ম্যাম! আমি তোমার বাবার সাথে দেখা করতে এসেছি। আমার নাম কেভিন ন্যাশ।
-ও তুমিই সেই ত্রাণকর্তা! তো এখন কি জন্য এসেছো? টাকা ফেরত নিতে? কত টাকা লেগেছিল?
-ম্যাম। তুমি বোধহয় অনেক রেগে আছো…আমি টাকা চাইতে আসি নি। তোমার বাবার সাথে দেখা করতে এসেছি। ঠিক আছে আমি না হয় পরেই আসি…

এমন সময়ে র‍্যাচেলের পেছনে ওর মা কে দেখা গেল। ওকে দেখেই হাসি দিয়ে বললেন,
-আরে ন্যাশ, এসো বাবা। তোমার জন্য আর্থার সেই সকাল থেকে বসে আছে।

ন্যাশ একবার র‍্যাচেলের রুদ্রমূর্তির দিকে তাকিয়ে ইতস্তত করে অবশেষে ভেতরে ঢুকলো। র‍্যাচেল দরজাটা দরাম করে লাগিয়ে দিয়ে ওর রুমে চলে গেল। সেদিকে তাকিয়ে রিটা বিব্রত একটা হাসি দিলেন।
-তুমি র‍্যাচেলের কথায় কিছু মনে কর না। ওর বাবাকে খুব ভালবাসে, গতকাল তুমি যাবার পরপরই বাসায় এসে আর্থারের ঐ অবস্থা দেখে খুব কষ্ট পেয়েছে। অনেকবার বলার পরও আর্থার মদ খাওয়া ছাড়ছে না।
-না না…আমি কিছু মনে করি নি…
-তুমি বসার ঘরে গিয়ে আর্থারের সাথে কথা বল। আমি কফি নিয়ে আসছি…
-থ্যাংক ইউ!

ড্রয়িং রুমে ইজি চেয়ারে বসে আর্থার স্থানীয় একটি পত্রিকা পড়ছিল। ন্যাশকে দেখে ওকে বসতে বলে সিগারেট ধরালেন। অফার করতেই একটি সিগারেট নিয়ে ধরালো ন্যাশ। বড় একটি টান দিয়ে ধোঁয়া ছুঁড়ে আর্থার কথা শুরু করলেন,
-গতকাল রাতের কথা খুব বেশি মনে নেই, তবে এটুকু মনে আছে তুমি আমাকে বিরাট ঝামেলা থেকে বাঁচিয়েছ। আর এখন এসেও মেয়ের কাছ ঝাড়ি খাওয়া থেকে রেহাই দিয়েছ, তাই তোমাকে ডাবল ধন্যবাদ!
-এটা কোন ব্যাপার নাহ্‌…
-একটা ব্যাপার আমার মনে আছে- তুমি আমার সম্পর্কে অনেক কিছু জানো এমনি আমার স্ত্রী-মেয়ের নাম পর্যন্ত। কিভাবে?
-আমার মামার নাম কেইন উইলিয়ামস, ১৫ বছর আগে মামা-মামী সানসিটিতে রেঞ্জ ওয়্যার এ মারা যান…

এটা শুনে আর্থারের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর আমতা আমতা করে বললেন,
-তা…তারমানে তুমি ফিল…
-হ্যাঁ, আমি ফিল আমার মামাত ভাই!
-কেমন আছে ও? কিছুটা সামলে প্রশ্ন করল আর্থার।
-ভালো আছে। ফিল এখন একজন ইউ এস মার্শাল।
-বাহ্‌! খুব ভাল।
-আর্থার, আমি তোমার কাছে জানতে এসেছি ঐ সময়ে সানসিটিতে আসলে কি হয়েছিল…
-আমার খোঁজ কার কাছ থেকে পেয়েছ?
-ডার্টি মরিসের কাছ থেকে, আমি গত কয়েকদিন ধরে সানসিটিতে আছি। এতক্ষণে হয়ত ফিলও পৌঁছে গেছে…ভালো কথা, আসার আগে আমি তোমার কেস রিপোর্ট দেখে এসেছি, কিন্তু আমার মনে হয়েছে তুমি যা লিখেছ-তারচেয়েও বেশি জানতে। মরিসের সাথে কথা বলে মনে হয়েছে ওর ভাবনাও একই রকম।

বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে আর্থার আবার মুখ খুলল,
-আমার তখন কিছুই করার ছিল না…কোন প্রমানই দাঁড় করাতে পারি নি। গোলাগুলি হবার কয়েকদিন পর এক সন্ধ্যায় ক্রিস এভার্টের একজন কাউবয় আমার কাছে এসেছিল, হার্ভি জনসন। মদ খেয়ে একেবারে চুর হয়ে ছিল। ঐ অবস্থায় আমাকে ও রেঞ্জ ওয়্যারের নামে ঠান্ডা মাথার খুনের কথা জানাল। ক্রিসই নাকি সবখানে আগে গুলি করেছে, কাউকে কথা বলার সুযোগও দেয় নি। আমি ওকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম ও সাক্ষ্য দেবার জন্য প্রস্তুত আছে কি না। জবাবে হ্যাঁ বলেছিল, ও নাকি বিবেকের দংশন সহ্য করতে পারছিল না। পরের দিন আমি ওর মৃত দেহ খুঁজে পাই! ছিনতাই এর পর হত্যা। অথচ শহরের সবাই জানত হার্ভির কাছে কখনোই দু-এক ডলারের বেশি টাকা পয়সা থাকত না!
-হ্যারি মার্টিনের ভূমিকা কি?
-হ্যারিকে আমার কখনোই কেউকাটা টাইপের মনে হত না। আমার ধারনা ক্রিস কোনভাবে ওকে নিয়ন্ত্রণ করত। অনেকটা খেলনা পুতুলের মতন।
-তুমি শহর ছেড়ে চলে এলে কেন?
-হার্ভি মারা যাবার পর একদিন মাতাল হয়ে আমি ক্রিস এর সাথে কথা কাটা-কাটি করি। কথায় কথায় হার্ভির প্রসংগ এসেছিল। ও আমাকে নিজের মুখে গর্ব করে হার্ভিকে খুন করার কথা জানিয়েছিল। পরের দিন ক্রিস আমার অফিসে এসে শাসিয়ে যায়, বাড়াবাড়ি করলে রিটা এবং র‍্যাচেলকে খুন করবে! আমার কাছে কোন প্রমানই ছিল না, তাই তোমার মা আসার পর ফিলকে তোমার মা এর কাছে সঁপে দিয়ে আমি শহর ছেঁড়ে চলে যাই। বেশ কয়েক জায়গায় ঘোরাঘুরি করে কয়েক বছর ধরে কারসন সিটিতে পাকাপাকি থাকছি। আমি ছোট একটি হার্ডওয়্যারের দোকান দিয়েছি, রিটা সাহায্য করে। র‍্যাচেল স্কুলে বাচ্চাদের পড়ায়। মোটামুটি চলে যাচ্ছে আমাদের দিন…
-সেলুনে এত বাকি পড়ল কেন?
-আমি একজন এলকোহলিক। আমাদের সব টাকা-পয়সা রিটা আর র‍্যাচেল দেখে। আমি যাতে মদ খাওয়া কমাই এজন্য ওরা আমাকে খুব কম টাকা দেয়…তাই…
-মদ খাবার ব্যাপারটি কি ‘ঐ’ ঘটনার পর থেকে শুরু হয়েছে??

আর্থার কোন জবাব না দিয়ে বিমর্ষ চেহারা নিয়ে বসে থাকায় ন্যাশ ওর প্রশ্নের জবাব পেয়ে গেল। এর মাঝে রিটা কফি দিয়ে গেল। কফিতে চুমুক দিয়ে আর্থারকে ন্যাশ প্রশ্ন করল,
-তুমি এদিকে অন্য কি কাজে এসেছ বলছিলে…
-তেমন কিছু না। আচ্ছা তুমি যে এখানে আছো সানসিটির ওরা জানলে সমস্যা হবে না?
-আমার মনে হয় না। ওরা ভাল করেই জানে এত দিন পরে আমি আর কিছুই করতে পারব না, তাছাড়া প্রমান ছাড়া তখনই কিছু করতে পারি নি…আর এখন এই এলকোহলিক এর কথা কে বিশ্বাস করবে?
-সেটা অবশ্য ঠিক। ঠিক আছে আমি এখন উঠব, আমাকে আজই সানসিটি ফিরতে হবে…রিটাকে বলো কফির জন্য ধন্যবাদ…নিজের যত্ন নিও…ও হ্যাঁ, ভাল কথা, আর বেশি আর মদ খেও না-এই কথাটা বলতে চাচ্ছিলাম তবে বললাম না…এই সপ্তাহে সানসিটিতে এমন কিছু ঘটনা ঘটবে যার পর তোমার হয়ত মদ খাওয়ার প্রয়োজনই পড়বে না!

হতবাক আর্থারকে পেছনে রেখে ন্যাশ বের হবার জন্য দরজার কাছে চলে এল। রিটাকে বিদায় জানিয়ে কিছুক্ষণ ইতস্তত করে বাসার বাইরে বের হয়ে এল। মনে মনে কিছুটা হতাশ, আশা করেছিল র‍্যাচেলের সাথে দেখা হবে!

বাড়ি থেকে বের হয়েই দেখল র‍্যাচেল পোর্চে একটি চেয়ারে বসে আছে। ওকে বের হতে দেখে উঠে দাঁড়ালো। ওর মা’র দিকে তাকিয়ে বলল,
-আমি ওকে এগিয়ে দিতে যাচ্ছি, সেখান থেকে একবারে স্কুলে চলে যাব।

রিটার মৌন সম্মতি দেখে দুজনে হাঁটা শুরু করল। কয়েক মুহুর্ত দুজনেই চুপচাপ হাঁটতে লাগল। র‍্যাচেলের চেহারার কাঠিন্য এখন অনুপস্থিত। বোঝা যাচ্ছে সন্ধির প্রস্তাব দিতে এসেছে! স্কুলে যাবার জন্য হালকা করে সাজগোজ করেছে বলে এখন দেখতে আরো সুন্দর লাগছে। একসময় র‍্যাচেল আস্তে করে বলল,
-সকালে দুর্ব্যবহার করার জন্য আমি দুঃখিত। আসলে বাবার উপর খুব মেজাজ খারাপ হয়ে ছিল।
-আমি কিছু মনে করি নি, মিস আর্থার।
-আমাকে র‍্যাচেল বলে ডাকতে পার…তুমি এই এলাকায় কি কোন কাজে এসেছিলে?
-আমি রেলওয়ের লোক। নেভাদা এবং ক্যালিফোর্নিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে আমাদের জরিপ চলছে। আপাতত সানসিটিতে আমার কাজ চলছে। এখানে এসেছিলাম তোমার বাবার সাথে দেখা করতে। বাকিটা তুমি তোমার বাবার কাছে জানতে পারবে…
-বাবার মদ খাবার ব্যাপারটি নিয়ে আমরা খুবই চিন্তিত ও বিরক্ত। বয়স হয়েছে, এখন যদি নিজের ভাল না বোঝে…
-র‍্যাচেল তোমাকে একটি জিনিস আমি জোর দিয়ে বলতে পারি-আর্থার আর মদ খাওয়া নিয়ে ঝামেলা করবে না, আমার উপর বিশ্বাস রাখতে পার…

র‍্যাচেল দাঁড়িয়ে কিছুক্ষকণ ওর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকল। কি বুঝলো কে জানে, তবে ওর চোখের উজ্জ্বলতা বেড়ে যাবার কারনে ন্যাশ বুঝতে পারল র‍্যাচেল ওর কথা পুরোপুরি আস্থার সাথে নিয়েছে। হাঁটতে হাঁটতে ওরা র‍্যাচেলের স্কুলের সামনে চলে এল।
-এটাই আমার স্কুল…বাচ্চারা চলে এসেছে মনে হচ্ছে…
-আমি তাহলে এগোই, আজকেই সানসিটিতে চলে যেতে হবে…

র‍্যাচেলের চোখে হতাশার একটু ঝিলিক দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল। পরমুহুর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
-তাহলে তোমাকে আর দেরি করিয়ে না দিই…তোমার সাথে পরিচিত হয়ে ভাল লাগল। ভাল কথা সেলুনে বাবার কত টাকা বাকি ছিল?
-একশ ডলার’ ভ্রু কুঁচকে জবাব দিল ন্যাশ, টাকার প্রসংগটা না আসলেই খুশি হত!
-এখন তো আমার কাছে অত টাকা নেই, আপাতত বিশ ডলার ফেরত দিচ্ছি। কথা দাও বাকি টাকা নিতে শীগ্রই ফিরে আসবে!

র‍্যাচেলের অনুরোধের ভেতরে আর্তিটা বুঝতে পারে ন্যাশের মুখে জমে ওঠা অন্ধকার ভাবটা কেটে গেল।
-র‍্যাচেল, আমি কথা দিচ্ছি-আমি অবশ্যই আসব! বলে হ্যান্ডশেক করার উদ্দ্যেশ্যে হাত বাড়িয়ে দিল। স্বাভাবিকের চেয়ে তিন/চার সেকেন্ড বেশি হাতটা দুজনে ধরে রেখে ধীরে ধীরে ছেড়ে দিল। ন্যাশ উলটো ঘুরে হোটেলের দিকে রওনা হল।

**********************************************

কারসন সিটির রেলওয়ের লোকজনের সাথে দেখা করতে গিয়ে ন্যাশের বেশ খানিকটা দেরি হয়ে গেল। ফলে রওনা দিতে দিতে প্রায় দুপুর গড়িয়ে গেল। ঘোড়ার উপর বেশি চাপ না দিয়ে যতটা সম্ভব দ্রত পথ চলতে থাকল। তবে আবহাওয়া খারাপ হয়ে যাবার কারনে সন্ধ্যার পর নদীর পাড়ের এক পরিত্যাক্ত ক্যাবিনে অবস্থান নিতে বাধ্য হল। সাথে খাবার থাকার কারনে সাপার করতে কোন সমস্যা হল না। খাবার না থাকলে এই পরিস্থিতিতে শিকার বা মাছ পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ত।

আবহাওয়া ভাল হতে বেশ বেলা হয়ে গেল, মেঘ কেটে গিয়ে রোদের আলো বের হতেই বের হয়ে পড়ল ও। দ্রুত চলার পরও হ্যারি মার্টিনের র‍্যাঞ্চের কাছাকাছি যখন পৌঁছলো সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে। মূল ট্রেইল ছেড়ে ধীরে ধীরে র‍্যাঞ্চের দিকে চলতে থাকল। র‍্যাঞ্চ হাউজে অনেকগুলো আলো জ্বলতে দেখা গেল। ঘোড়া থেকে নেমে হেঁটে হেঁটে এগোতে থাকল ন্যাশ। মাঝারি আকারের একটি ঝোপ দেখে সেখানে দাঁড়িয়ে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। বোঝার চেষ্টা করল এই মুহুর্তে কতজন আছে! হঠাৎ পঞ্চাশ/ষাট গজ পেছনে মট করে ডাল ভাঙ্গার শব্দ হল।

লাফ দিয়ে পাশের এক ঝোঁপের আড়ালে গিয়ে পড়ল ন্যাশ, ইতোমধ্যে রিফ্লেক্স অনুযায়ী দুই হাতে পিস্তল উঠে এসেছে। কিছুক্ষণ পর একজনের গলা শোনা গেল,
-হ্যালো স্ট্রেঞ্জার! হাতের পিস্তল ফেলে দাও। তিনটি রাইফেল তোমাকে কাভার করছে!
গলা শুনে বুঝতে পারল কথাগুলো বলল হ্যারি মার্টিনের ফোরম্যান, হেনরি ওয়াকার! সেফটি অফ করে পিস্তল দুটো হোলস্টারে রেখে দুই হাত মাথার উপরে নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল ন্যাশ। রাইফেলের নলের মুখে কোন জোরাজুরি চলে না। তাছাড়া ও কোন ঝামেলা করতে তো আর আসে নি!
-বন্ধু ওয়াকার! আমি কেভিন ন্যাশ। সেদিনের দাওয়াত আজ কবুল করতে এলাম…

আয়েসি ভঙ্গিতে রাইফেল কাঁধে নিয়ে ওয়াকার ধীরে ধীরে কাছে এল। অন্ধকার ফুঁড়ে আরো দুজনকে আসতে দেখা গেল, সেদিনের সেই দুই সাগরেদ! দূরের আবছা আলোয় ওয়াকারের কুৎসিত মুখ দেখা গেল।
-ওয়েল, ওয়েল…কি সৌভাগ্য আমাদের! মহামান্য ন্যাশ আমাদের গরিবখানায়?? আজ যে কার মুখ দেখে উঠেছিলাম…
-আমি শিওর নিজেরটা দেখো নি, ঐ মুখ দেখে যার সকাল শুরু হয় তার কখনো ভাল কিছু…’ ন্যাশ ওর কথা শেষ করতে পারল না। রাইফেলের বাট দিয়ে ওয়াকার ওর পেটে আঘাত করল। ব্যাথায় পেট ধরে কুঁজো হয়ে যেতেই মাথায় আবার আঘাত করল, অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে গেল ন্যাশ।

১০।

হুশ ফিরতে বেশি দেরি হল না ন্যাশের। নড়াচড়া করতে গিয়ে টের পেল হাত-পা বাঁধা। নিপুনভাবে বাঁধার কারনে এক চুলও নাড়াতে পারল না। পরিস্থিতি ভাল তো হলই না, বরং মাথার ব্যাথাটা ফিরে আসার কারনে আবার প্রায় অজ্ঞান হবার সম্মুখিন হল। ব্যাথায় দপ দপ করতে থাকা মাথায় ভেজা ভেজা ভাব অনুভব করল, বুঝলো ভালোই রক্ত ঝরেছে। একটু ধাতস্থ হয়ে আশপাশে দেখার চেষ্টা করল, দেয়ালের ফুটো দিয়ে আসা আবছা আলোয় বুঝলো ওকে বার্ন হাউজে রাখা হয়েছে। এমন সময়ে বাইরে পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেল। দরজা খুলে লন্ঠন হাতে ওয়াকার ঢুকল। সাথে অন্য আরেকজন লোক।
-ন্যাশ! কেমন আছো বন্ধু?
-তুমি আসার আগে মাথার ব্যাথাটা বাদ দিলে মন্দ ছিলাম না। কিন্তু এখন বাজে দুর্গন্ধে মারা যাচ্ছি, কতদিন গোসল কর না তুমি?

কথাটা শুনে ওয়াকারের চোখ দপ করে জ্বলে উঠল। তেড়ে ন্যাশের দিকে এগোতেই পাশের লোকটি মুখ খুলল। ‘এনাফ, ওয়াকার!’ নির্দেশ শুনে ওয়াকার থেমে গেলেও ওর মুখ দেখে বোঝা গেল ব্যাপারটি পছন্দ হয় নি। অবশ্য সামলে নিয়ে আস্তে করে এক পা সাইডে সরে গেল। এতক্ষণে ন্যাশ অন্যজনকে দেখতে পেল। দামী পোশাক ও কেতাদুরস্ত ভাব দেখে বুঝল এ হ্যারি মার্টিন। হাতে একটি বড় কাগজ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
-ন্যাশ, আমি তোমাকে কিছু প্রশ্ন করব- আশা করি সঠিক জবাব দেবে। যদি মনে হয় তুমি ভুল তথ্য দিচ্ছ, ওয়াকারকে আমি আর থামাবো না। বুঝেছ?
-বুঝতে পেরেছি।
-‘এই কাগজটা তুমি কোথায় পেয়েছ? তুমি কি রেল বিভাগের লোক?’ হাতের যে কাগজটি দেখিয়ে মার্টিন প্রশ্ন করল ন্যাশ ভাল করে দেখে বুঝল ওটা রেলরোডের ম্যাপ। সম্ভবত ও অজ্ঞান হবার পর কেউ স্যাডল হাতরে ওটা পেয়েছে!
-ওটা কিছু না…আমি নানা জায়গায় ঘুরি তো, তাই শখের বশে নিজেই একটি ম্যাপ তৈরি করেছি…

শান্তভাবে মার্টিন ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। এবার ওয়াকারের দিকে ঘুরে মাথা ঝাঁকিয়ে ইশারা দিল। ওয়াকার লন্ঠনটি মাটিতে রেখে খুশিতে এগিয়ে এসে ন্যাশকে প্রথমে দাঁড় করালো এবার ঘরের মাঝে থাকা কাঠের পিলারের সাথে ভাল করে পিছমোড়া করে বেঁধে দিল। মার্টিন আবার মুখ খুলল,
-তোমাকে আরেকবার সুযোগ দিচ্ছি-ম্যাপটি কথায় পেয়েছ?
-আচ্ছা ঐ ম্যাপটি? ওটা আমি রাস্তায় কুড়িয়ে পেয়েছি…’ নির্বিকার গলায় বলল ন্যাশ।

এবার ওয়াকার আর বসের ইশারার জন্য অপেক্ষা করল না, এগিয়ে গিয়ে ন্যাশের তল পেটে পটাপট দু’তিনটি ঘুষি মারল। ব্যাথায় ন্যাশ কুঁজো হয়ে গেল, তবে দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে গেল- মুখ দিয়ে ফোঁসফোঁস করে হালকা আওয়াজ ছাড়া এক ফোঁটাও শব্দ বের হল না!

-তুমি অনেক টাফ লোক, কিন্তু সবারই একটি নির্দিষ্ট মাত্রা পর্যন্ত সহ্য ক্ষমতা আছে! কেন মিছেমিছি কষ্ট করছ? তাছাড়া তুমি সহযোগিতা করলে আমাদের দুজনেরই হয়ত লাভ হবে…রেলবিভাগে চাকুরি করে এমন অনেক মানুষকেই আমি রাতারাতি বড়লোক হতে দেখেছি। চিন্তা করে দেখ-তোমার কোন কষ্টই করতে হবে না…

বেশ কিছুক্ষণ ধরে ন্যাশ চিন্তা করতে থাকল। মার্টিনও ওকে সময় দিল, বুঝলো ন্যাশ নিজের সাথে মনে মনে বোঝাপড়া করছে। এক সময় মনে হল ন্যাশ হাল ছেড়ে দিল।
-ঠিক আছে, আমি যা জানি বলছি। তবে তার আগে কথা দিতে হবে আমার সাথে কোন প্রকার দুই নম্বরি করা চলবে না, আর সবার আগে আমার বাঁধন খুলে দিতে হবে…’
-বস, ওর কথা শুনো না। ব্যাটা দুনিয়ার শয়তান, বাঁধন খুলে দিলে ঝামেলা করবে…
-তোমার কাছে পরামর্শ চাইলে তখন কথা বল, ঠিক আছে? এর আগে পর্যন্ত মুখটা বন্ধ রাখো। এবার ন্যাশের বাঁধন খুলে দাও।
-তুমি বস, তুমি যা বলবে তাই হবে…’ বেজার মুখে কথাটা বলে ন্যাশের হাত খুলে দিল ও।

হাতটা ডলে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক করে নিল ন্যাশ। এরপর ওয়াকারের দিকে তাকিয়ে বলল,
-তুমি এবার যেতে পার। বড়রা কথা বলার সময়ে তোমার থাকার দরকার নেই…

মার্টিন বাঁধা দিল না দেখে ন্যাশের দিকে অগ্নি দৃষ্টি দিয়ে ওয়াকার ঘর থেকে বের হয়ে গেল। ওরা দুজনে দুটো টুলে বসল। ন্যাশ কথা বলা শুরু করল,
-ট্রান্স-কন্টিনেন্টাল রেলরোডের কথা শুনেছ?
-সেটা তো অনেক আগে থেকেই শুনে আসছি…
-হ্যাঁ, তবে ওটা এখন আর কল্পনা নয়-বাস্তব! আগামী দু’এক বছরের মধ্যে কাজ শুরু হবে। ইঞ্জিনীয়ার জুডাহ এই বিশাল প্রজেক্টের মূল কারিগর। খুব শিঘ্রই ও সেক্রেটারি অব দ্যা হাউজ হতে যাচ্ছে, যার একটাই মানে-ট্রান্স-কন্টিনেন্টাল রেলরোড এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র! দুটো কোম্পানী মিলে এই রেলরোড স্থাপনের কাজ করবে- ক্যালিফোর্নিয়া ভিত্তিক সেন্ট্রাল প্যাসিফিক এবং পূব দিকের স্টেট-ভিত্তিক ইউনিয়ন প্যাসিফিক। সেন্ট্রাল প্যাসিফিক স্যাক্রামেন্টো থেকে পূব দিকে রেল রোড স্থাপন করবে এবং ইউনিয়ন প্যাসিফিক ওমাহা থেকে পশ্চিম দিকে অগ্রসর হতে থাকবে। দুটো পথ এসে মিলিত হবে উতাহ্‌ এর উত্তর প্রান্ত প্রমোন্টরিতে। প্রায় তিন হাজার মাইলের এই পথ তখন কয়েক মাসের বদলে কয়েক দিনেই পাড়ি দেয়া সম্ভব হবে। ধরে নিতে এর ফলে গোটা আমেরিকা জুড়ে একটি বিপ্লব ঘটে যাবে! সেন্ট্রাল প্যাসিফিক এর মূল কর্ণধার থাকবে জুডাহ্‌, আর এই অধম, কেভিন ন্যাশ, তাঁর ডান হাত! সুতরাং…
-ভূমি অধিগ্রহন করে শুরু হচ্ছে?
-আমি এবার গিয়ে রিপোর্ট জমা দিলেই ক্যালিফোর্নিয়া অংশের শুরু হবে, তারমানে এই ধর…দেড়-দুই মাস!
-তোমার কাছে যে ম্যাপটি আছে ওটাই কি ফাইনাল?
-স্যরি! ওটা আগেই বলতে পারছি না…বুঝতেই পারছ, আমার কাছে একটি ট্র্যাম কার্ড রেখে দিতে চাচ্ছি!
-অলরাইট! তবে আমিও তোমার মতন সাবধানী লোক। সুতরাং একটু খোঁজ খবর না করে তোমার সাথে পাকা কোন কথা বলব না। তোমার ব্যাপারে একটু খোঁজ খবর নিতে চাই…
-অবশ্যই!
-ঠিক আছে, তুমি বিশ্রাম কর। আমার লোক তোমাকে ফার্স্ট এইড বক্স ও খাবার দিয়ে যাবে, তোমার পিস্তল ছাড়া বাকি সব জিনিস ফেরত দিয়ে দিচ্ছি-ক্ষতটার যত্ন নাও, খাওয়া-দাওয়া কর, বিশ্রাম কর। আর হ্যাঁ, বাইরে আপাতত পাহারা থাকবে, সুতরাং আগামী কয়েক ঘন্টা তোমার সহযোগিতা আশা করছি…
-নো প্রবলেম!
-আমার শেষ প্রশ্ন- তুমি আজ এখানে কেন এসেছিলে?
– বললে বিশ্বাস করবে কি না জানি না- আমি তোমাকে বিজনেস ডিল এর অফার দিতেই এসেছিলাম… কেননা, এই শহরে তুমি আর ক্রিস ছাড়া আর কারো ক্ষমতা নেই এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করার…মানুষ হিসেবে ক্রিস এর থেকে তোমার গ্রেড ভাল, অন্ততঃ সানসিটির সাধারন মানুষদের সার্টিফিকেট অনুযায়ী! তাছাড়া সেদিন তুমি দাওয়াত দিয়েছিলে, তখন তো আসতে পারি নি…এজন্য আজ অসময়ে হলেও চলে আসলাম, বেটার লেইট দেন নেভার! রাইট?
-তাহলে প্রথমে এত ঘাড় তেরামি করলে কেন?
-যাতে তুমি বুঝতে পার আমি মানুষটা সহজ নই…
-চমৎকার। মজার ব্যাপার কি জান? আমি নিজেও জানতাম তুমি রেলের লোক- তোমার পাঠানো টেলিগ্রামের খবর আমার কাছে অনেক আগেই চলে এসেছিল। জানার পরও তোমার সাথে আজ জোর খাটালাম যাতে তোমার ধরনটা বুঝতে পারি! সুতরাং, আমরা মনে হয় পরস্পরকে ভাল করেই চিনতে পেরেছি, কি বল?
-নিঃসন্দেহে!
-যাইহোক, আমাকে এখন যেতে হচ্ছে, গুড নাইট।
-গুড নাইট!

১টি মন্তব্য “ওয়েস্টার্নঃ ঠান্ডা প্রতিশোধ! ৫ম পর্ব”

মওন্তব্য করুন : তাহমিনা শবনম

জবাব দিতে না চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।