ওয়েস্টার্নঃ ঠান্ডা প্রতিশোধ! ৪র্থ পর্ব

পর্ব ১
পর্ব ২
পর্ব ৩

৭।

ভোরের আলো ফোঁটার আগেই বের হয়ে পড়ল ন্যাশ। শেরিফকে কারসন সিটির কথা না বলে ভূমি জরিপের কথা বলেছে ও। কারো মনে অযাচিত কৌতুহল উদ্রেক আপাতত না করাই ভাল হবে। দুই দিনের মত খাবার সাথে নিয়ে বের হচ্ছে- আশা করছে নদীর তীরবর্তী এলাকা হবার কারনে শিকার বা মাছের অভাব হবে না।

দুলকি চালে শহর থেকে বের হয়েই গতি বাড়াবার জন্য ঘোড়াকে নির্দেশ দিল। ঘোড়াটাও কয়েকদিন পর ছুটতে পেরে আনন্দে গতি মাথা ঝাঁকিয়ে গতি বাড়িয়ে দিল। খুরের আঘাতে ট্রেইল থেকে ধুলোর এক মেঘ পেছনে রেখে ছুটতে থাকল।

কয়েক মাইল নির্জন এলাকা পার হবার পর প্রাণের অস্তিত্ব দেখা গেল। বুঝতে পারল এটাই হ্যারি মার্টিনের র‍্যাঞ্চ। দূরে অনেকগুলো হৃষ্টপুষ্ট গরু চরে বেড়াচ্ছে। গত কিছুদিন ধরে বৃষ্টি হবার কারনে পুরো এলাকা সবুজ ঘাসে ছেয়ে গেছে। গরুগুলোও তাই মনের আনন্দে ঘাস খেতে পারছে। গরুর পরিমান এবং স্বাস্থ্য দেখে ন্যাশ বুঝতে পারল খুব শীগ্রই এগুলো বিক্রি করা হবে। ন্যাশ কিছুদিন কাউহ্যান্ডের কাজ করেছে, র‍্যাঞ্চিং সম্পর্কে তাই ওর ভালোই জ্ঞান আছে।

প্রথমে একবার ভাবল হেনরি ওয়াকারের সাথে দেখা করবে কি না। পরে সে চিন্তা বাদ দিল। কারসন সিটি থেকে ফেরার পথে আলাপ করা যাবে। তাছাড়া এখন দেখা করলে কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে- এরকম নানা কৌতুহল ওর মাথায় আসতে পারে। কারসন সিটিতে গিয়ে র‍্যাঞ্জ ওয়ারের সময়ে ওর ভূমিকা কি ছিল সেটা আগে জেনে নিতে পারলে ওর সাথে আলাপ করা সহজ হবে।

সাবধানে র‍্যাঞ্চ এলাকাকে পাশ কাটিয়ে পথ চলতে থাকল ও। ধীরে ধীরে বড় গাছের সংখ্যা বাড়তে দেখে বুঝতে পারল নদীর কাছাকাছি এসে পড়েছে। ট্রেইল ধরে এগোতে থাকল ওর ঘোড়া। হঠাৎ একটা ছোট বাঁক ঘুরতেই নদীটি দেখতে পেল। খুব বেশি প্রশস্ত না হলেও মোটামুটি জোরেই স্রোত বইছে। বেশ কিছুক্ষণ পথ চলার কারনে ঘোড়াটাকে পানি খাবার ব্যাপারে আগ্রহী মনে হল। ও বাধা দিল না। ঘোড়া থেকে নেমে নিজেও পানি খেল, ক্যান্টিনটা ভরে নিল, ঘোড়াটাকেও পানি খাবার সুযোগ দিল। সম্ভবত আশপাশের কোন পাহাড়ি ঝরনা থেকে নদীটির উৎপত্তি হয়েছে। নদীর পানি একেবারে স্বচ্ছ, নিচের বালি পর্যন্ত পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। বালির রঙ কিছুটা হলুদাভ, একারনেই বোধহয় গোল্ড ডাস্ট নাম হয়েছে! পানি বেশ ঠান্ডা, পান করতেও বেশ ভাল লাগল। আশাপাশের এলাকাটা আরেকবার দেখে নিয়ে ডার্টি মরিসের নির্দেশনা অনুযায়ী পথ চলা শুরু করল।

নদীর পাড় ধরে চলার কারনে ওর ঘোড়া খুব বেশি গতিতে চলত পারছে না। ন্যাশও তেমন জোর করল না, কারন ওর কোন তাড়া নেই। এই এলাকায় ইন্ডিয়ান বা অন্য কোন বিপদের আশংকাও নেই। তাছাড়া ঘোড়ায় চলার সময়টুকু ও বেশ উপভোগ করে। ছুটে চলার মত রোমাঞ্চকর জিনিস খুব কমই আছে। চলতে চলতে নিজের মনে অনেক ভাবনা খেলা করে চলছে। নিজের অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যত নিয়ে ভাবছে। সানসিটির কারো এখনো কোন ধারনা নেই ও কি কারনে এখানে এসেছে। শেরিফকে যদিও বলেছে ভূমি জরিপ করার কাজ, তবে আসলে এসেছে রেলওয়ের জন্য জরিপের কাজে। শেরিফের কাছ থেকে প্রথমে লুকিয়েছে কেননা শেরিফ কেমন মানুষ নিজে আগে যাচাই করে নিতে চেয়েছিল। এখন মনে হচ্ছে ওর সাথে ব্যাপারটা শেয়ার করাই যায়।

গোল্ডরাশের পর এ অঞ্চলে রেললাইন বসানো জরুরী হয়ে পড়েছে। স্টেজ বা ঘোড়ায় চড়ে যারা আসছে তারা পথে নানা বিপদ-আপদের শিকার হচ্ছে, সময়ও অনেক বেশি লাগছে। পানি পথে যারা আসছে তাদেরও সময় কম লাগছে না এবং খরচও বেশি হচ্ছে। এ কারনে অনেক দিন ধরেই একটি রেলপথের কথা ভাবা হচ্ছে যা আমেরিকার পূব এবং পশ্চিমের মধ্যে সংযোগ সৃষ্টি করবে। একে বলা হচ্ছে ট্রান্স-কন্টিনেন্টাল রেলরোড। এই রেল পথের ধারনা শুরু হয়েছিল আরো আগেই, ১৮৪০ এর দিকে। তবে নানা কারনে তা আলোর মুখ দেখে নি। গোল্ডরাশের পর সবাই আবার নতুন করে চিন্তা-ভাবনা করা শুরু করে। এ ব্যাপারে সবচেয়ে অগ্রনী ভূমিকা রয়েছে ইঞ্জিনীয়ার থিওডর জুডাহ। তিনি নিজে বিভিন্ন শহরগুলোয় ঘুরে ঘুরে জরিপ করেছেন, প্রভাবশালী লোকদের সমর্থন আদায় করেছেন। কাজ শেষ হলে ওমাহা থেকে নেব্রাস্কা, প্ল্যাটল রিভার, সাউথ পাস দিয়ে রকি মাউনটেইন, উতাহ্‌ এর উত্তর প্রান্ত, নেভাদা হয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার সরাসরি যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হবে। ইতোমধ্যে চালু হওয়া ওরেগন, মরমন এবং ক্যালিফোর্নিয়ার কয়েকটি ট্র্যাকও এর সাথে যুক্ত হবে।

১৮৫৩ সালে বিখ্যাত ‘গডসডেন পারচেজ’ এর মাধ্যমে আমেরিকা মেক্সিকোর কাছ থেকে ৪৫,৫৩৫ বর্গ মাইল জমি কিনে নেয়। গিলা নদীর দক্ষিণ ও এল পাসো ডেল নর্তে’র পূবের এই বিস্তৃত জমি কেনার ফলে ক্যালিফোর্নিয়া যাবার সম্ভাব্য দক্ষিণ রুটটি মোটামুটি নিশ্চিৎ করা সম্ভব হয়। তবে তখন পর্যন্ত কংগ্রেস রুটের ব্যাপারে নিশ্চিৎ ছিল না বলে পূব থেকে পশ্চিমে যাবার রুটটি ঠিক করা জন্য একদল জরিপকারী পাঠায়। এদিকে ক্যালিফোর্নিয়ার প্রাদেশিক সরকার দেরি দেখে নিজেরাই রেললাইন বসাবার কাজ শুরু করে দেয়। ১৮৫৫ সালে পরীক্ষামূলকভাবে স্যাক্রামেন্টো থেকে পূব দিকে ফলসন এবং প্ল্যাসার পর্যন্ত রেলপথ চালু হয়। ১৮৫৬ সালে সেটা সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়।

ন্যাশ জানে অল্প কিছুদিনের মধ্যে থিওডর জুডাহ’র নেতৃত্বে সেন্ট্রাল প্যাসিফিক রেলরোড কর্পোরেশন শুরু হতে যাচ্ছে। তার সাথে থাকবে প্রেসিডেন্ট লে’ল্যান্ড স্ট্যানফোর্ড, ভাইস প্রেসিডেন্ট হান্টিংটন, ট্রেজারার মার্ক হপকিন্স এবং শ্রমিক বিষয়ক বিশেষজ্ঞ চার্লস ক্রোকেন। আড়ালে এদেরকে ‘বিগ ফোর’ নামেও ডাকা হয়ে থাকে। তবে আশঙ্কার কথা হচ্ছে দাসপ্রথা ও অন্যান্য কিছু ইস্যু নিয়ে দেশে যে মতবিরোধ ও রেষারেষি চলছে তা গৃহযুদ্ধে রূপ নিতে পারে। সেটা হলে দেশের পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে তা বলা মুশকিল। তবে সব কিছু থাকলে খুব শীঘ্রই ট্রান্স-কন্টিনেন্টাল রেলরোড এর কাজ শুরু হবে বলে আশা করছে ওরা। ওদের কাজ এই এলাকায় নতুন করে রেললাইন বসাতে হবে, নাকি বর্তমান লাইন দিয়েই কাজ চালানো যাবে কি না- তার উপর চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়া। মূলত মাইকেল মুর ও তার দল যাবতীয় কাজ করবে, ও সাথে থাকবে ইঞ্জিনীয়ার জুডাহ এর প্রতিনিধি হিসেবে।

তবে রেল এর জন্য জরিপও ন্যাশের সানসিটিতে আসার মূল কারন নয়। ওর মামা-মামী হত্যার প্রতিশোধ নেয়াটাই মূল কারন! এখনো মনে আছে যেদিন প্রথম ফিল ওদের বাসায় এসেছিল সেদিনের কথা। মা যখন ওকে নিয়ে বাসায় ঢুকলেন তখনো ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। ছোট্ট মনে যে আঘাত পেয়েছিল সেটা সেরে উঠতে ওর অনেক দিন লেগেছিল। ন্যাশ ওর চেয়ে তিন বছরের বড় হবার কারনে সবসময় ছোট ভাই এর মতন আগলে রাখত। ১৫ বছর বয়স থেকে যখন পিস্তল চালানো শুরু করে তখন থেকেই ফিল বলত একদিন ওর বাবা-মা এর হত্যার বদলা ও নেবে। এরপর ধীরে ধীরে সেটা দৃঢ় সংকল্পে পরিনত হয়। প্রথম দিকে ন্যাশ ওকে বোঝাবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। নিবৃত্ত করা যাবে না দেখে একসময় নিজেও ওর সাথে যোগ দেয়। গত দুই বছর ধরে ওরা নানা গবেষনা-আলোচনা করে অবশেষে নিঁখুত একটি পরিকল্পনা দাঁড় করিয়েছে। ন্যাশ রেল বিভাগে চাকরি করার কারনে ওদের পরিকল্পনায় ট্রান্স-কন্টিনেন্টাল রেলরোডের বড় একটি ভুমিকা আছে।

দিনের আলো দ্রুত কমে আসছে দেখে রাতটা পথেই কাটাবার সিদ্ধান্ত নিল ন্যাশ। সেই দুপুর বেলা খাওয়া-দাওয়া করে একটু বিশ্রাম নিয়েছিল, খুব ক্লান্ত লাগছে। ওর হিসেব অনুযায়ী কারসন সিটি আর খুব একটা বেশি দূরে নেই। আগামীকাল ভোরে রওনা দিলে কারসনসিটিতে গিয়ে ভরপেট নাস্তা করতে পারবে বলে আশা করছে। কোন কাজে তাড়াহুড়া করা ওর স্বভাবে নেই, ফিল অবশ্য একটু ছটফটে! ন্যাশ ওর কাছ থেকে কথা আদায় করেছে যে বদলার নামে কোন ঠান্ডা মাথার খুন করা চলবে না। কেননা ফিল নিজে এখন আইনের একজন-ইউ এস মার্শাল! ওরা যে পরিকল্পনা করেছে সেই অনুযায়ী সব কিছু হলে একবারে খুন করার চেয়েও অনেক ভাল প্রতিশোধ নেয়া যাবে! ওদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র চমক! এখনো কেউই জানে না ওদের আসল পরিচয়। ফিলকেও কেউ চিনতে পারবে না, কেননা ও নাম বদলে ন্যাশের বাবার শেষ নাম ‘কলিন্স’ গ্রহণ করেছে। সুতরাং তাড়াহুড়া না করে কিছুটা অপেক্ষা করতে ন্যাশের কোন আপত্তি নেই। ফিলও তা বুঝবে আশা করি, কেননা- প্রতিশোধ যত ঠান্ডা হয়, তত মিঠে হয়!!

৮।

কারসন সিটি।

যাত্রা শুরু করতে একটু দেরি হবার কারনে ন্যাশের পৌঁছতে প্রায় দুপুর হয়ে গেছে। একটি হোটেলে উঠে গোসল করে দুপুরের খাবার খেয়ে কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে নিল। এরপর যখন বের হল তখন প্রায় বিকেলের শেষ সময়। মরিস ঠিকই বলেছিল- কারসন সিটি আসলেই অনেক বড় এবং জমজমাট। তবে একটি ব্যাপার মরিস সম্ভবত জানে না- কারসন সিটি ক্যালিফোর্নিয়া নয়, বরং নেভাদার মধ্যে অবস্থিত। কারসন সিটি সম্পর্কে ওর যত জ্ঞান তা সবই লোকমুখে শোনা এবং কাগজ দেখে শোনা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। সেন্ট্রাল প্যাসিফিক রেলরোডের প্ল্যানে এই শহর বেশ গুরুত্বপূর্ণ, কেননা ওদের প্ল্যান অনুযায়ী এখানে বড় একটি রেল জাংশন হবার কথা। সেটা হলে শহরটি আরো বড় এবং জনবহুল হয়ে উঠবে-তাতে কোন সন্দেহ নেই। শনিবার হবার কারনে বিকেল থেকেই শহরটা মানুষে একেবারে গমগম করছে। এত মানুষের ভীড়ে এরিক আর্থারকে কিভাবে খুঁজে বের করবে ভেবে কিছুটা চিন্তায় পড়ে গেল। ঠিক করল প্রতিটা সেলুন ঘুরে দেখবে। পশ্চিমের কোন শহরের কাউকে খোঁজার জন্য সবচেয়ে ভাল জায়গা হচ্ছে সেলুনগুলো। বারটেন্ডারগুলো হচ্ছে যে কোন তথ্যের জন্য সবচেয়ে ভাল উৎস। প্রথম তিনটে সেলুনে খোঁজ নিয়ে আর্থারের ব্যাপারে কোন হদিস না পেয়ে কিছুটা হতাশ হয়ে গেল ও।

চার নম্বরে সেলুনে ঢুকে সোজা বারটেন্ডারের কাছে গিয়ে পৌঁছলো। হুইস্কি নিয়ে আয়েশ করে বসে চুমুক দিয়ে চারদিকে এক নজর দেখে নিল। সেলুন ভর্তি মানুষ। কাউহ্যান্ড, জুয়ারি, খনি শ্রমিক ছাড়াও সম্ভ্রান্ত চেহারার অনেককে দেখতে পেল। হুইস্কিতে বড় এক চুমুক দিয়ে শেষ করে বারটেন্ডারকে জিজ্ঞাসা করল,
-এরিক আর্থার নামে কাউকে চেন নাকি?
-কেন তোমার কেউ হয় নাকি? ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করল সে।
-আমার বন্ধুর বন্ধু হয়’-খুব সাবধানে মেপে মেপে কথাটি বলল ন্যাশ।

এটা শুনে বারটেন্ডার গলা উঁচু করে ডাক দিল, ‘চেকভ, এখানে এসো তো। আর্থারের একজন বন্ধু পাওয়া গেছে।‘ প্রায় সাত ফুট লম্বা বিশালদেহী এক রাশান বারের কাছে আসতেই ন্যাশ বুঝতে পারল- ও-ই চেকভ। এসে ঘোঁত ঘোঁত করে বলল, ‘বস, আমাকে ডেকেছো?’
-চেকভ নামে আর কেউ আছে এখানে?
-আমি তো সবাইকে চিনি না, বস!
-আরে, গাধা! তোমাকেই ডেকেছি! ব্যাটা উজবুক!!
-সরি বস।
-এবার আরেকবার বল মিস্টার, এরিক আর্থার তোমার কেমন বন্ধু? মানে, বন্ধুর জন্য পয়সা খরচ করতে পারবে তো? ন্যাশের দিকে তাকিয়ে বারটেন্ডার বলে উঠল।
-তোমার কথা বুঝলাম না!
-এরিক আর্থার বাকিতে খেয়ে আমাদের সেলুন খালি করে ফেলেছে। আজ টাকা না দিলে ওকে ঝুলিয়ে রাখব বলেছিলাম। দেখতেই পাচ্ছ- ও আজকেও টাকা দেয় নি।‘ কথাটা বলে বার থেকে দূরের এক দেয়ালের দিকে ইশারা করল। ন্যাশ দেখতে পেল ওখানে প্রায় নয় ফুট উঁচুতে এক লোক দেয়ালে আটকে থাকা বিশাল শিং এর সাথে লটকে আছে! শিংটা সম্ভবত বাইসনের, ‘অত উঁচুতে ওকে কিভাবে ঝুলালো?’ ভাবতেই জবাব পেয়ে গেল-চেকভ! অবশ্য চেকভের শিশুসুলভ বিকারহীন মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু বোঝার উপায় নেই। ঝুলন্ত লোকটির বয়স এরিক আর্থারের বয়সের সাথে মেলে। মাথায় কাঁচার চেয়ে পাকা চুলের সংখ্যাই বেশি।

-আমি সম্ভবত ওর খুব ভাল বন্ধু হতে যাচ্ছি, তবে তার আগে নিশ্চিৎ করতে চাই ও আসলেই এরিক আর্থার কি না!
-তোমার যা মর্জি! হারামজাদা আজকেও হুইস্কি খেয়েছে, বলেছিল সব টাকা একবারে শোধ করবে!
-আপাতত মুখটা বন্ধ করে রাখো, ওর সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়ে গেলে তোমার কথায় আমি হয়ত অপমানিত বোধ করব! ইশারাটা ধরতে পেরে বারটেন্ডার চুপ করে গেল।

ন্যাশ উঠে লোকটার কাছে গিয়ে মাথার হ্যাট খুলে ওর পায়ে হালকা বাড়ি দিল। গুঙিয়ে উঠতেই বুঝলো লোকটা সজাগ আছে, তবে অনেকক্ষণ ঝুলে থেকে ভয়ে একেবারে কাহিল!
-তোমার নাম এরিক আর্থার? প্রশ্ন শুনে লোকটা চোখ মেলে তাকালো।
-হ্যাঁ। কিছুটা দ্বিধান্বিত কন্ঠে বলল ও।
-তোমার স্ত্রী রিটা এবং মেয়ের নাম র‍্যাচেল??
-কে তুমি?? এত কিছু জানো কিভাবে? ওর কথা শোনা বোঝা গেলে হুইস্কির নেশা কিছুটা হলেও কেটে গেছে। ‘দোহাই লাগে, আমার মেয়ের কোন ক্ষতি কর না, বিশ্বাস কর, আমি তোমার সব টাকা শোধ করে দেব।‘
-শান্ত হও। আমি তোমার বা তোমার পরিবারের কোন ক্ষতি করতে আসি নি। তোমার কাছ থেকে কিছু তথ্য জানতে এসেছি। তবে তার আগে নিশ্চিৎ হতে চাই, তুমিই কি সেই এরিক আর্থার?
-হ্যাঁ, আমিই এরিক আর্থার…কিন্তু…তোমাকে আমি চিনতে পারছি না…
-পরিচয় দিই-আমার নাম কেভিন ন্যাশ। আর আমাকে তুমি এখনো চেন না-কিন্তু বিশ্বাস কর, এই মুহুর্তে আমিই তোমার বেস্ট ফ্রেন্ড!!

*******************************************

আর্থারকে ‘শিং আসন’ থেকে নামিয়ে আনতে ন্যাশের একশো ডলার খরচ হয়ে গেল। বুঝতে পারছে বারটেন্ডার শয়তানী করেছে, কিন্তু কিছু করার নেই। ও যদি পাঁচশো ডলারও চাইত তাই মেনে নিতে হত। এই মুহুর্তে কোন ঝামেলায় জড়ানো বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।

আর্থারের এক হাত নিজের কাঁধে নিয়ে ওকে হাঁটতে সাহায্য করল। আর্থারের নির্দেশনা অনুযায়ী দশ মিনিট হেঁটে একটি ছোট্ট বাসার সামনে উপস্থিত হল ওরা। দরজা নক করতেই একজন বয়স্ক মহিলা দরজা খুলে দিলেন। ন্যাশ ধারনা করল ইনিই রিটা। চেহারায় বয়সের ছাপ পড়লেও বোঝা যায়, এক সময় যথেষ্ট সুন্দরী ছিলেন। সবচেয়ে বড় কথা ওনার চোখে-মুখে মা’সুলভ ভাব প্রবল। ন্যাশের নিজের মা এর কথা মনে পড়ল। আজ দুই বছর হল মা মারা গেছেন। বুকের মধ্যে একটু কষ্ট অনুভব করল ও।

-ওহ, আর্থার, তুমি ঠিক আছো, ডার্লিং?
-ম্যাম, একদম চিন্তা করবেন না। উনি ঠিক আছেন। হুইস্কি একটু বেশি খেয়ে ফেলার কারনে…
-কতবার তোমাকে বলেছি ড্রিংক করা ছাড়তে…ঐ সব ছাই-পাশ খেয়েই…
-ম্যাম, আমার মনে হয় না উনি কিছু বুঝতে পারছেন। আগে চলুন তাঁকে খাটে শুইয়ে দেই।

দুজনে ধরাধরি করে আর্থারকে খাটে শুইয়ে দিল। বেচারা একেবারে কাহিল হয়ে গেছে। হুইস্কির নেশার সাথে ভয় মিলে নার্ভাস ব্রেক ডাউনের মতন অবস্থা হয়ে গেছে। এই অবস্থাতেও রিটাকে বললেন,
-সুইটহার্ট, এই ইয়াং ম্যান আজ আমার জীবন বাঁচিয়েছে। ওর ঠিক মতন যত্ন নাও। ইউ নো হোয়াট, আমি নিজেই ওকে আজকে সাপার…’ বলতে বলতে আর্থার ঘুমিয়ে পড়ল!

মুচকি হেসে ন্যাশ রিটাকে বলল,
-ম্যাম, ও এখন বিশ্রাম করুক। আমি কাল সকালে এসে খোঁজ নিয়ে যাব।
-তুমি কে বাবা? জীবন বাঁচাবার কথা ও কি বলল?
-ওসব কিছুই না। হুইস্কি পেটে থাকলে ওরকম অনেকেই অনেক কিছু বলে…’ মরিসের বলা সেই উক্তিটা ঝেড়ে দিল!
-তোমার নাম কি?
-আমি কেভিন ন্যাশ, রেল বিভাগে কাজ করি। এই এলাকায় একটি কাজে এসেছিলাম। এক বন্ধুর অনুরোধে ওর সাথে পরিচিত হতে চেয়েছিলাম। এখন তো আর কথা বলার মতন অবস্থা নেই, আগামীকাল সকালে এসে কথা বলব।
-ঠিক আছে বাবা, গুডনাইট।
-গুডনাইট, ম্যাম!

৪ টি মন্তব্য : “ওয়েস্টার্নঃ ঠান্ডা প্রতিশোধ! ৪র্থ পর্ব”

মওন্তব্য করুন : জুনায়েদ কবীর (৯৫-০১)

জবাব দিতে না চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।