নাগরদোলা

১. সুমন তার বড় ভাই আলম এর সাথে বাড়ির পশ্চিম দিকের রাস্তা ধরে হাঁটছে, খিদায় তার পেট চো চো করছে। সে আলমকে বার বার বলছে, “ভাইজান, খিদা লাগছে তো, কিছু খাওন দাও।” আলম এগার বছর বয়সেই বুঝে গেছে অভাব কি জিনিস, ঘরে যে খাবার নেই সে তা ভালমত জানে। কিন্তু ছোট ভাইটার প্রতি এত মায়া তার যে সে কথা সে ভাইকে বলতে পারে না। ছোট ভাইটার মুখের দিকে সে তাকাতে পারে না, গত দুইদিন না খেয়ে ভাইটার মুখ শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। সে বলে, “আরেকটু সবুর কর, আমি ব্যবস্থা করতেসি”। গত দুই দিন সে সাহস পায় নাই,কিন্তু আজকে সে নিরুপায় হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে মণ্ডলবাড়ির আমবাগানে চুরি করতে যাবে। ঘরে খাবার নাই, চাইলে কেউ খেতেও দেয় না, দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়। কাজের এতই আকাল যে কেউ আজকাল ফুটফরমাশ খাটতেও ডাকে না। আমবাগানের কাছাকাছি এসে দুই ভাই কিছুক্ষণ ঘুরাঘুরি করল, ভাল করে দেখে নিল পাহারাদার সবুজ মিয়া আশে পাশে আছে কিনা। তারপর সুমনের ঘ্যানর ঘ্যানরে থাকতে না পেরে আলম এক সময় ভাইকে নিয়ে ঢুকে গেল আমবাগানে। গ্রীষ্মের গাছপাকা আম দেখেই লোভ লাগে। আলম বাগানের এক কোনায় একটা গাছে চড়ে বসল আর ভাইকে বলল নিচ থেকে আম কুড়িয়ে নিতে। ভাইটা এতই ছোট যে তাকে পালানোর ব্যাপারে কিছু বলেও লাভ নাই। সবুজ মিয়া আশেপাশেই ঘুরাঘুরি করছিল, আম পড়ার শব্দে সে দৌড়ে এল। এমনিতে সুমন হয়ত দৌড়ে পালিয়ে যেতে পারতো, কিন্তু পাঁচ বছরের ভাইটাকে তো ফেলে আসা যায় না। দুজনকে ধরে মণ্ডল বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হল। তারপর সবসময় যা হয়, তাই হল। দুই ভাইকে বেদম প্রহার করা হল। মারের জন্য মণ্ডল সাহেব এলাকায় বেশ সুপরিচিত। এসব ছোটলোক অমানুষদের মেরে তিনি অপার্থিব আনন্দ পান, অন্যরকম আত্মশ্লাঘা অনুভব করেন। আলম বয়সে বড় বলে তার ভাগে মারটা বেশি পড়ল। আলম যখন অজ্ঞান হয়ে পড়ল, সবুজ মিয়া তখন মণ্ডল সাহেবকে থামাল। সবুজ মিয়াই গিয়ে জব্বার আলীকে বিকালবেলা খবর দিল। জব্বার আলী এসে দুই ছেলেকে নিয়ে গেল, যাওয়ার আগে মণ্ডল সাহেবের হাতে-পায়ে ধরে মাফ চেয়ে নিল।

 

২. ঘরের দাওয়ায় বসে আছে রহিমা। কি করবে ভেবে উঠতে পারছে না। গত কয়দিন ধরে ঘরে কোন দানাপানি নাই। ছেলে দুইটা গত দুইদিনে একবার কলাসিদ্ধ খেয়েছে শুধু। এদিকে চুরির সন্দেহে ব্যাপারী বাড়িতে তার ঠিকা কাজটি চলে গেছে। তার স্বামী জব্বার আলী দিনমজুরি করে। কিন্তু বছরের এই সময়টায়  তেমন কোন কাজ থাকে না। গত এক মাসে একদিন মাত্র কাজ পেয়েছে সে। একটা একচালা ঘরে তারা চারজন মানুষ কোনমতে থাকে, তাও ঘরটা জব্বার আলী পৈতৃক সূত্রে পেয়েছিল বলে রক্ষা, না হলে কোথায় ওদের জায়গা হত রহিমা ভাবতেই পারে না। তারা স্বামী-স্ত্রী দুই জন না হয় পানি খেয়ে কোনমতে চালিয়ে নিচ্ছে, কিন্তু বাচ্চা দুইটা ছেলেকে কিভাবে না খাইয়ে রাখা যায় এতদিন? মাঝে মাঝে নিজেকে খুব ছোট আর অপরাধী মনে হয়, টাকা পয়সা নাই বলে নিজেকে ধিক্কার দেয় রহিমা, বাচ্চা দুইটার ক্ষুধার্ত মুখ দেখলে নিজেকে ঠিক রাখতে পারে না। সুমন যখন ‘মা, খিদা লাগছে, খাওন দাও’ বলে আকুতি করে, তখন রহিমার মনে হয় নিজের গলায় ছুরি বসায় দেয় অথবা যে দিকে দুই চোখ যায় চলে যেতে ইচ্ছে করে সব ছেড়েছুড়ে। জীবনের প্রতি এক ধরনের বিচ্ছিরি ঘৃণা জমে আর সৃষ্টিকর্তার প্রতি অভিমান। সৃষ্টিকর্তার প্রতি অভিমান ভালমত জমে উঠার আগেই সে দেখে জব্বার আলী দুই ছেলেকে নিয়ে বাড়ির দিকে আসছে। আলম খোঁড়াচ্ছে, কাছাকাছি আসার পর রহিমা চিৎকার দিয়ে আলমকে জড়িয়ে ধরে ঘরে নিয়ে শোয়াল। দুই ভাইয়েরই চোখের নিচে শুকিয়ে যাওয়া কান্নার দাগ। কিছুক্ষণ পরেই আলমের শরীর কাঁপিয়ে জ্বর আসলো, পাশের বাড়ি থেকে অনেক চেয়েচিন্তে সরিষার তেল এনে আলমের বুকে মালিশ করতে লাগলো আর থেকে থেকে বিলাপ করে কাঁদতে লাগল রহিমা। ক্লান্ত সুমন এর মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছে। জব্বার আলী ঘুমন্ত সুমনের দিকে একবার তাকিয়ে আবার বেরিয়ে গেল যদি কোন টাকা-পয়সা অথবা খাবারের সন্ধান করা যায়।

 

৩. মধ্যরাত পর্যন্ত এখানে ওখানে অনেক চেয়েচিন্তেও বিফল হয়ে ফিরল জব্বার আলী। মানুষের মধ্যে এতটুকু দয়ামায়া নাই কেন সে কিছুতেই তার হিসাব মিলাতে পারে না। সে ঘরে গিয়েই শুয়ে পড়ল, আর ওদিকে রহিমা সারারাত আলমের মাথার কাছে বসে রইল। জব্বার আলী সারারাত ঘুমাল না, এপাশ-ওপাশ করল শুধু। এ নিয়ে এই ধরনের ঘটনা কয়বার ঘটল সে হিসাব করে বের করতে পারে না। তার মনের অবস্থা রহিমার থেকে কোন অংশেই ভাল নয়, পুরুষ মানুষ হয়ে নিজের ছেলেদের খাবারে ব্যবস্থা করতে পারছে না, এর থেকে অপমান আর দুঃখের কোন কিছু হতে পারে না তার জন্য। এবার একটা কিছু করে ফেলতেই হবে তাকে। ভোরবেলা সে দুই ছেলেকে বলল নন্দিয়া মেলায় নিয়ে যাবে, ওখানে গিয়ে অনেক কিছু খাওয়াবে। আলমের জ্বর এক নিমিষেই ভাল হয়ে গেল, সেও সুমনের মত সবচেয়ে ভাল জামাকাপড় পড়ে চুল আঁচড়ে নিল। দুই ভাইয়ের চোখে তখন অপার আনন্দ।

 

৪. হেঁটে হেঁটে তিনজন গোমতী ব্রিজের উপর উঠে এল। দুই ভাই অনবরত কথা বলতে লাগল জব্বার আলীর সাথে, আর হাজার রকমের আবদার। দুই ভাইয়েরই নাগরদোলায় উঠার খুব শখ, গত বছরের মেলায় টাকার অভাবে নাগরদোলায় চড়তে পারে নাই, এবার চড়বেই চড়বে। এদিকে সুমন আবার মাঝে মাঝেই তার অদৃশ্য ঠেলাগাড়িটা চালাতে লাগল, তার হেলিকপ্টার এর মত পাখাওয়ালা একটা ঠেলাগাড়ির খুব শখ। পাশের বাড়ির শ্যামলের কাছে দেখেছে সে ওটা। সে তার বাবাকে বলল, “বাবা, তুমি আসলেই ঠেলাগাড়ি কিনে দিবা?” গলায় তার অনিশ্চয়তার সুর। বাবা এত ভাল হয়ে গেল কেন এটা সে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। জব্বার আলী হাসিমুখে বলল, ‘হু বাবা দিব তো’। সুমনের মুখ থেকে তাও অবিশ্বাসের ছায়া সরে না। এর মধ্যে তারা ব্রিজের মাঝামাঝি চলে আসল। হঠাৎ করে জব্বার আলীর দেহে বিদ্যুৎ খেলে গেল। এক ঝটকায় আলমকে দুই হাতে তুলে রেলিং এর উপর দিয়ে নিচে গোমতীর উদ্দাম স্রোতের মধ্যে ফেলে দিল সে। সুমন প্রথমে বুঝে উঠতে পারেনি ঘটনা কি হচ্ছে, বুঝতে পেরেই সে দৌড় দিল। কিন্তু পাঁচ বছরের বাচ্চা দৌড়ে কয়েক কদম যেতেই জব্বার আলী তাকে ধরে ফেলল।

 

তারপর সুমন দেখল সে উড়ে যাচ্ছে, তার কাছে মনে হল সে যেন নাগরদোলায় চড়েছে, আশেপাশের সব কিছু এত দ্রুত সরে সরে উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে, দমকা বাতাসে ওর বুক কেঁপে উঠল। এই কয়েক মুহূর্তে তার মনে হল, এই পাঁচ বছরের জীবনে যা চাওয়ার ছিল তা সে পেয়ে গেছে। হঠাৎ করে তার তিন বছরের বড় বোনটার মুখ মনে পড়ল, গত বছর যে নিউমোনিয়ায় মারা গেছে। দিদি তাকে অনেক আদর করত। গোমতীর শীতল স্রোত সুমনকে পরম মমতায় টেনে নেয়ার আগে সুমন মনে মনে বলল, “দিদি, আমি আসছি রে তোর কাছে।”

 

 

পুনশ্চঃ কয়েকদিন আগে পত্রিকায় দেখলাম এক পিতা তার পাঁচ আর এগার বছরের দুই সন্তানকে ব্রিজের উপর থেকে নদীতে ফেলে দিয়ে মেরে ফেলেছে। কারণ কি? কারণ হচ্ছে অভাব, খাবারের অভাব। আমরা কি একবার সুমন, আলম, জব্বার আলী কিংবা রহিমার জায়গায় নিজেদেরকে বসাতে পারি? আমাদেরও তো জন্ম হতে পারতো ওরকম কোন পরিবারে। আমাদেরও হয়তো আমাদের বাবারা এভাবে ছুঁড়ে ফেলতেন, কিংবা আমরা আমাদের সন্তানদের।

 

৮৪৫ বার দেখা হয়েছে

৪ টি মন্তব্য : “নাগরদোলা”

  1. রেজা শাওন (০১-০৭)

    প্রথম ব্লগ নাকি তানভীর ভাই?

    স্বাগতম। এখন ফ্রন্টরোল দেওয়া বাকী থাকলো শুধু।

    লেখার মেসেজটা খুব হৃদয়গ্রাহী। চারপাশের কত তুচ্ছ বিষয় আমাদের নাড়া দিয়ে যায়, অথচ যে বিষয়গুলোতে মুহূর্তেই আমাদের চারপাশ দুলে ওঠার কথা-সেটা কি হয়?

    হয় না মনে হয়।

    জবাব দিন
    • তানভীর (২০০০-২০০৬)

      :frontroll: :frontroll: :frontroll:

      চারপাশ দুলে উঠে না দেখেই খুব অবাক হই রে ভাই, আমি কারো সাথে কথা বলতে গেলে তারা বারবারই বলে যে বাংলাদেশের মানুষের তেমন কোন অভাব নাই, রিকশাওয়ালাদেরও নাকি অনেক টাকা! কিন্তু এই খবরগুলা যখন পত্রিকায় আসে তখন কি তারা চোখ বন্ধ করে রাখে?

      আচ্ছা, একটা স্পর্শকাতর টপিক নিয়ে তোমার কিছু লেখার কথা ছিল, ঐটা কি লিখছ? আমি কিন্তু ঐটার জন্য অপেক্ষা করছিলাম বেশ কিছুদিন... আর এখানে আমার display name এ কোন সাল থেকে কোন সাল আসে না কেন? মানে অপশনই আসে না...

      জবাব দিন
  2. রিদওয়ান (২০০২-২০০৮)

    এরকম খবর দেখে আমরা দু'দিন পরেই ভুলে যাই, কিন্তু এরকম গল্প সেই ঘটনাগুলো বাঁচিয়ে রাখে। অনেক ভাল লাগল ভাই। :clap: আরও লেখা আশা করছি আপনার কাছ থেকে।

    জবাব দিন

মওন্তব্য করুন : তানভীর

জবাব দিতে না চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।