আমাদের অস্তিত্ব – শেষ পর্ব

আমাদের অস্তিত্ব – ১
আমাদের অস্তিত্ব – ২

প্রথম পর্বে বলেছিলাম “ব্রেইন ইন আ ভ্যাট” তত্ত্বের কথা। আর দ্বিতীয় পর্ব ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশ এবং এর বিষয়ে দার্শনিকদের উঠানো “মন” সংক্রান্ত প্রশ্ন নিয়ে। এই শেষ পর্বে এসে এই দুটিকে মিলিয়ে আমাদের সামনে কি দাঁড়ায় তা দেখা যাক।

ধরা যাক, আগের পর্বের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর অনুভূতির সমন্বয়ে রোবট তৈরি করা হয়েছে। যে রোবট কিনা বিভিন্ন অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে। আবার তার নিজের বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করে সিদ্ধান্তও নিতে পারে। এখন এমন একটা রোবটকে সেই “ব্রেইন ইন আ ভ্যাট” পরীক্ষার মধ্যে ফেলা যাক। ব্রেইন ইন আ ভ্যাট যদিও মূলত কাল্পনিক একটা তত্ত্ব বা ধারণা ছিল, এই রোবটের বেলায় আমরা কিন্তু সহজেই সেটা করে দেখতে পারব। শুধু মানুষের মস্তিষ্কের জায়গাতে রোবটের কপোট্রন (এটা একটা কল্প-বৈজ্ঞানিক শব্দ, মূল বিজ্ঞানে ব্যবহৃত হয় না) বসিয়ে নিতে হবে।

তো ধরা যাক ঐ কপোট্রনটা রোবটের বাকী যন্ত্রাংশ/শরীর থেকে আলাদা করে একটা সিমুলেশন সিস্টেমের সাথে সংযুক্ত করা হল। যেই সিস্টেম কপোট্রনটিকে প্রয়োজনীয় সমস্ত সিগনাল পাঠাবে। আবার সাথে সাথে কপোট্রন থেকে আসা সিগনালগুলোও সে গ্রহণ করে সিমুলেশনে পরিবর্তন করবে। তাহলে কি ঘটবে? সাধারণভাবে বলা যায়, রোবটটা এবং চারপাশের পরিবেশের মধ্যে যেসব সিগনাল বা সংকেত আদান-প্রদান হত, সেসব সংকেত যদি ঐ সিমুলেশন সিস্টেমের সাথেও আদান-প্রদান হয়, তাহলে রোবটটা(বা কপোট্রনটা) এটা বুঝতে পারবে না যে, সে আসলে একটা সিমুলেশনের মধ্যে আছে। একটু খেয়াল করে দেখুন, আগের বাক্যটিতে একটি ‘যদি’ আছে। অর্থাৎ শর্ত হল, সিমুলেশন সিস্টেমটা একদম নিখুঁত হতে হবে। নাহলে রোবটটা বুঝে ফেলবে যে সে এখন একটা সিমুলেশনের মধ্যে আছে। কিন্তু যদি এমন হয় যে, কপোট্রনটিকে একেবারে প্রথম থেকেই সিমুলেশনের মধ্যে রাখা হল? তাহলেও কি সে বুঝতে পারবে যে সে কোন বাস্তব জগতে নেই? সে যা দেখছে, শুনছে অনুভব করছে তা একটা সিমুলেশন মাত্র? এক্ষেত্রে কিন্তু তার বোঝার সম্ভাবনা অনেক কম। কারণ তার কাছে তুলনা করার জন্য অন্য কোন জগতের কোন তথ্য নেই।

এখন দেখা যাক, কপোট্রনটি দুটি জগত কিভাবে তুলনা করবে যেখানে একটা বাসতব আর আরেকটা ঐ বাস্তব জগতেরই সিমুলেশন? কোথায় পার্থক্য হবে? একদম সরাসরি অসামঞ্জস্য না থাকলে পার্থক্যগুলো হবে-
-বিস্তৃতিতে। সিমুলেশনের তুলনায় মূল বাস্তব অনেক বেশি বিস্তৃত হবে বা বেশি জায়গা নিয়ে থাকবে।
-জটিলতায় এবং সূক্ষতায়। বাস্তব জগতের নিয়মগুলো অনেক বেশি জটিল ও সূক্ষ হবে।
উদাহরণ হিসেবে ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবালের একটা উপন্যাসের কথা বলা যায়। নাম মনে পড়ছে না। সেখানে কয়েকটা মানুষের স্মৃতিকে একটা সিমুলেশনের মধ্যে পাঠিয়ে দেয়া হয়। তারা বুঝতে পারে যে সেটা একটা সিমুলেশন। কারণ ছিল তারা দেখেছিল একটা শহরের বাইরে সেখানে আর কিছুই নেই(বিস্তৃতি)। এবং কোন একটা সার্কিট খুলে নিলে সবার শরীরের নীচের অংশ নাই হয়ে যায়(সরাসরি অসামঞ্জস্য/যথেষ্ট জটিল নিয়ম নয়)।

তবে এখানে যদি কপোট্রনের ক্ষমতা সীমিত করে দেওয়া হয়, যেন সে সিমুলেশনের ও বাস্তব জগতের বিস্তৃতি ও সূক্ষতার পার্থক্য বুঝতে না পারে, তাহলে উভয় জগতে রাখলেও তুলনা করে সে দুটোর পার্থক্য বুঝতে পারবে না। মনে করবে দুটো একই জগত। অন্যদিকে যদি কপোট্রনের ক্ষমতা এমন হয় যে, সে প্রথম থেকে সিমুলশনের মধ্যে থেকেও এর বিস্তৃতি এবং জটিলতার অভাবকে বুঝতে পারে, তাহলে সে সিমুলেশনের মধ্যে থেকেও তার জগতকে সিমুলেশন হিসেবে সন্দেহ করতে পারে খুব সহজেই। যদিও সে এর কোন প্রমাণ পাবে না। কারণ সে নিজেই ঐ সিমুলেশনের নিয়ম-কানুন দ্বারা আবদ্ধ। তবে এক্ষেত্রে তার জন্য খুব স্বাভাবিক একটা কাজ হবে মূল বাস্তব জগতের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা।

এখন আবার ঐ কপোট্রনের কাছে ফিরে আসা যাক। ঐ কপোট্রনের মধ্যে কি আছে? আছে একটা মেমোরি বা তথ্যভান্ডার, মূল সিস্টেমের সাথে (বাস্তব বা সিমুলেশন) যোগাযোগের কিছু মাধ্যম, আর একটা প্রসেসর যা ঐ সংকেতগুলো এবং মেমোরির বর্তমান অবস্থাকে প্রসেস করে মেমোরিকে আপডেটকে করবে এবং সিস্টেমে পাঠানোর জন্য নতুন সিগনাল বা সংকেত তৈরি করবে। এই প্রসেসিং-এর জন্য যে বুদ্ধিমত্তা প্রয়োজন সেটাও অ্যালগোরিদম(তথ্যকে প্রসেস বা প্রক্রিয়াজাত করার ধাপবিশিষ্ট নির্দিষ্ট পদ্ধতি) হিসেবে ঐ মেমোরিতেই থাকবে। একটু খেয়াল করে দেখুন, সিমুলেশনের জন্য যে সিস্টেমটি থাকবে, সেটারও কিন্তু এসব অংশ আছে- মেমোরি এবং প্রসেসর। কিন্তু সেগুলো অপেক্ষাকৃত জটিল এবং অধিক ক্ষমতা সম্পন্ন, এই যা। এখন যদি কপোট্রনটিকে পুরোপুরি আলাদা না করে মূল সিস্টেমের মেমোরিতেই কপোট্রনের মেমোরিকে রাখা যায়, মূল সিস্টেমের প্রসেসিং ক্ষমতার কিছু অংশ কপোট্রনের জন্য আলাদা করে দেয়া হয় আর আগে যে যোগাযোগটা অন্য কোন বাইরের মাধ্যমে হচ্ছিল, সেটা বাকী সিস্টেমের সাথে সরাসরিই করার ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে কিন্তু কপোট্রনের কাজের কোন হেরফের হবে না। শুধু লাভের মধ্যে যা হবে, সরাসরি হওয়ার কারণে যোগাযোগটা আরেকটু তাড়াতাড়ি হবে। যারা টেকী তারা জানেন, অবজেক্ট অরিয়েন্টেড প্রোগ্রামিং-এ এভাবেই বিভিন্ন অবজেক্টকে বাস্তবিকভাবে(physically) আলাদা না করে যৌক্তিকভাবে(logically) আলাদা রাখা হয়। সে হিসেবে কপোট্রনটি হবে একটি অবজেক্ট। আর সিস্টেমের মধ্যে এমন আরও অনেক অবজেক্ট থাকতে পারে। কয়েকটি অবজেক্ট নিয়ে অন্য নতুন একটা অবজেক্ট তৈরি হতে পারে। আর পুরো সিস্টেমটা হবে এমন অনেকগুলো অবজেক্টেরই সমষ্টি মাত্র।

একটু উদাহরণ দিই আবার। ধরুন শুধু রোবটদের একটা শহর আছে যেটা বাকী সমস্ত কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন। সেখানে রোবটরাই বুদ্ধিমত্ত্বাসম্পন্ন সমস্ত কাজ করে। সেখানে রোবট ছাড়াও আরও অনেক কিছু আছে। এখন এই সমস্ত কিছুকে একটা সিমুলেশন সিস্টেমের মধ্যে আনা হল। সব রোবটগুলোকেও আনা হল। তাহলে প্রত্যেকটি রোবট হবে সিমুলেশন সিস্টেমের এক একটি অবজেক্ট। আবার রোবট ছাড়া বাকী জিনিসগুলিও এমন কিছু অবজেক্ট। কিন্তু ভিন্ন ধরণের। হয়ত সেগুলোর সাথে সংশ্লিষ্ট অ্যলগোরিদমগুলো অনেক সহজ। আর রোবটগুলোর অ্যালগোরিদম বুদ্ধিমত্ত্বার জন্য মানানসই বিধায় অপেক্ষাকৃত জটিল। আবার এসব অবজেক্টগুলো হতে পারে অন্য ছোট কিছু অবজেক্টের সমষ্টি। যেমন কোন যন্ত্রের যন্ত্রাংশগুলোর আলাদা আলাদা কাজ থাকে। এসব অবজেক্টের একটা থেকে আরেকটা অবজেক্টে রূপান্তরেরও নিয়ম থাকতে পারে। তো যাই হোক, এমন সব অবজেক্ট নিয়েই পুরো সিমুলেশন সিস্টেমটা। অথচ রোবটগুলি এর কিছুই বুঝতে পারবে না। এমনকি সিমুলেশন সিস্টেমের মধ্যে কিছু পরিবর্তন আনলেই ঐ শহরটাকে আমাদের পুরো বিশ্বজগৎ(Universe) এর মত কিছু বানিয়ে দেয়া যাবে। কিছু অতিরিক্ত অবজেক্ট আমদানী করতে হবে মাত্র।

আমরা যদি পুরো সিস্টেমটাকে এখন একটু অ্যাবস্ট্রাক্ট বা বিমূর্তভাবে দেখি তাহলে ব্যাপারটা কি দাঁড়ায়? এই সবকিছুই খুব ভালভাবে সংগঠিত(organized) একটা ডেটাবেইজ বা তথ্যভান্ডার, যেটা কিনা কিছু ক্ষমতা ব্যয় করে সবসময় নিজেকে আপডেট করছে। আর এই তথ্যভান্ডারটা অনেকগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে বিভক্ত যাদের আপডেট হওয়ার নিয়ম আলাদা। আর আপডেট করার নিয়মও ঐ তথ্যেরই অংশ মাত্র যেটা একেকটা ক্ষুদ্র অংশের সাথ সংশ্লিষ্ট(associated)। দ্বিতীয় পর্বের শেষে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, রোবটদেরও মন থাকবে কিনা, যদি একে বুদ্ধিমত্তা দেওয়া হয়। এখনকার প্রেক্ষিতে প্রশ্নটি পরিবর্তন করে বলছি, এমন একটা সিস্টেমের ঐসব ক্ষুদ্র তথ্যাংশ বা অবজেক্ট, যাদের সাথে নিজের মেমোরিকে আপডেট করার এমন জটিল অ্যালগোরিদম আছে যেটা আমাদের বা অন্যান্য প্রাণীদের বুদ্ধিমত্তার সাথে তুলনীয়, তাদেরও কি মন থাকবে? আপনার আগের উত্তরটা যদি হ্যাঁ হয়, এখনকার উত্তরটাও হ্যাঁ হওয়া উচিত। কারণ, আগের রোবটার সাথে এই তথ্যাংশটির বাস্তবিক(physical) আকার বা অস্তিত্ব না মিললেও যৌক্তিক(logical) কোন পার্থক্য নেই। ঐ রোবটের কপোট্রনটি যা করত, এই তথ্যাংশটিও একই কাজ করছে।

এতক্ষণ পর্যন্ত সিমুলেশনের কথা বলতে বারবার বলেছি সিমুলেশন সিস্টেমের নাম। স্বাভাবিকভাবেই একথা শুনে সবার যান্ত্রিক কম্পিউটারাইজড একটা সিস্টেমের কথা মনে হয়। আর আমার বর্ণনাটাও অনেকটা সেইরকমই ছিল। এখন বলি, এটা যে কম্পিউটারাইজড বা যান্ত্রিক কোন সিস্টেম হতে হবে, এমন কোন ধরা-বাঁধা নিয়ম নেই। বরং তথ্য সংরক্ষণ এবং প্রক্রিয়াজাত করার ক্ষমতা সম্পন্ন যে কোন কিছুই এই সিস্টেম হিসেবে কাজ করতে পারবে। এমন একটি ক্ষমতা সম্পন্ন সিস্টেম আমাদের সবার সাথেই আছে- আমাদের মস্তিষ্ক। বা আমাদের মন, যাই বলেন। আমাদের মনের মধ্যেও কিন্তু আমরা এমন একটা সিমুলেশন চালাতে পারি। উপন্যাস লেখাটা আমার কাছে এমন একটা সিমুলেশন চালিয়ে তা প্রকাশ করার কাছাকাছি কিছু একটা মনে হয়। কিন্তু আমাদের মস্তিষ্কের সীমাবদ্ধতা হল, আমরা খুব বেশি জটিল সিমুলেশন তৈরি করতে পারি না। সিমুলেশনের তথ্যভান্ডারের অনেক তথ্যাংশকে একই সাথে(simultaneously) নিজস্ব নিয়মে মত আপডেট হতে দিতে পারি না। আর আমরা আমাদের চিন্তা-ভাবনা দিয়ে সিমুলেশনকে প্রভাবিত করে ফেলি। তবে অনেক সময় অবচেতনভাবেই আমরা এমন কিছু সিমুলেশন তৈরি করে ফেলি যেখানে আমাদের নিজস্ব বিচার-বুদ্ধির প্রভাব থাকে অনেক কম। স্বপ্নের কথা বলছি। যদিওবা সেটা হয়ত খুব জটিল পর্যায়ে যেতে পারে না। এখন আরেকটা অদ্ভূত প্রশ্ন করি। স্বপ্নের কোন ক্যারেক্টার বা চরিত্রের ‘মন’ তৈরি হওয়ার মত বুদ্ধিমত্তা(বা অ্যালগোরিদম) মনে হয় থাকে না। যদি থাকত তাহলে কি ওদেরও ‘মন’ তৈরি হত?

এখন দেখুন, সিমুলেশন সিস্টেমের ভিতরের তথ্যাংশ বা চরিত্রগুলো কিন্তু বাইরের কোন খবর জানবে না, যদি না তাদের জানানো হয়। তবে অনুমান বা কল্পনা তো অবশ্যই করতে পারবে। বাইরের থেকে সিস্টেমটা কিভাবে চলছে, সিস্টেমটা কেমন বা তথ্যগুলোর স্বরূপ কি এটাও জানতে পারবে না। আর ঐ পরিমাণ বুদ্ধিমত্তা না থাকলে, জানালেও বুঝতে পারবে না। কারণ এধরণের অ্যাবস্ট্রাক্ট চিন্তা করতে চরিত্র বা সত্তাগুলোকে যথেষ্ট বুদ্ধিমান হতে হবে। কারণ, স্বাভাবিকভাবেই সে তার নিজের সিস্টেমের নিয়ম-কানুনের বাইরে চিন্তা করতে অভ্যস্ত না।

আরও একটা ব্যাপারে আসি। সেটা হল, যিনি সিমুলেশনটির পরিকল্পনা করবেন এবং পরিচালনা করবেন, পুরো সিস্টেমের উপরে তার থাকবে অপরিসীম ক্ষমতা। তিনি যেকোন নিয়ম সেখানে চালাতে পারেন। সেখানে পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলি পাল্টে দিয়ে নিজের মত করে দিতে পারেন। একেবারে নতুন কোন সূত্রও দিয়ে দিতে পারবেন। সময়ের ব্যাপারটা এখন তো পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মেই আপেক্ষিক। যেটা চিন্তা করতে আমরা ঠিক অভ্যস্ত না। পরিকল্পনাকারী চাইলে সিমুলেশনের ভিতরে এই সময়কেও পালটে দিতে পারবেন। যারা কোন কম্পিউটার গেমের পুরা সিস্টেম ডিজাইন বা পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করেছেন, তারা এর কিছুটা স্বাদও পেয়ে থাকবেন। যদিও এখন পর্যন্ত কম্পিউটার গেইমগুলোতে আমাদের পরিচিত জগতের পদার্থবিজ্ঞানকেই অনুকরণ করার চেষ্টা করা হয়, কিছু ব্যাতিক্রমও আছে। যেখানে ভিন্ন ধরণের পদার্থবিজ্ঞান সূত্র ব্যবহার করা হয়েছে।

এখন আমি ঐ প্রশ্নটা আবার করছি যেটা প্রথম পর্বের শেষে করেছিলাম এবং এই সিরিজের নামও যেটা বলে। আমাদের অস্তিস্বও কি এমন আপেক্ষিক? বা আরও সহজভাবে বললে আমরাও কি এমন একটা সিমুলেশনের মধ্যে আছি? আমাদের আশেপাশের পুরো বিশ্বজগতটা যেই সিমুলেশন সিস্টেমেরই একটা প্রকাশ? এর খুব সহজ উত্তরটা হল “জানি না”। কারণ আমরা কোন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা চালিয়ে বলতে পারব না যে, আমরা “সিমুলেশনের মধ্যে আছি(প্রমাণিত)” বা “সিমুলেশনের মধ্যে নাই (প্রমাণিত)”। তবে আমাদের মনের চিন্তার ঘোড়াকে ছুটিয়ে দিতে তো কোন দোষ নেই। আর এটা স্বীকার করতেই হয়, যদি আমরা একটা সিমুলেশনের ভিতরে থেকেও থাকি, এই সিমুলেশনটা আমাদের বুদ্ধিমত্তার তুলনায় যথেষ্ঠই বিস্তৃত আর জটিল।

আবার জাফর ইকবাল স্যারের একটা গল্পের কথা মনে পড়ে গেল। “ওমিক্রনিক রূপান্তর” বইতে ঐ নামেই একটা গল্প ছিল। একটা মহাকাশ অভিযান থেকে পৃথিবীতে ফেরার সময় নভোচারীরা আবিষ্কার করে যে এর মধ্যে পুরো পৃথিবী একটা রূপান্তরের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে। যেটা হল “ওমিক্রনিক রূপান্তর”। এই ওমিক্রনিক রূপান্তর আর কিছুই না। পৃথিবীর পুরো সিস্টেমটাকে একটা সিমুলেশন সিস্টেমে নিয়ে যাওয়া। সেখানে এই পৃথিবী বা জগতের সবই থাকবে। কিন্তু পৃথিবীতে মানুষ যে ভুলগুলো করে ফেলেছে সেগুলো পরিহার করা হবে। সমস্ত মানুষের মেমোরিকে ঐ সিস্টেমে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। নভোচারীদেরকেও ঐ রূপান্তরের মধ্যে দিয়ে যেতে বলা হয়। কিন্তু তারা সেটা না করেই পৃথিবিতে ফিরে আসেন। সেখানে দেখেন বসবাসের অযোগ্য এক গ্রহকে।

সব শেষে এমন একটা তত্ত্বের কথা বলব যেটা বলে যে, আমরা সিমুলেশনের মধ্যে আছি। যদিও সেটা সরাসরি না। স্বাভাবিকভাবেই তত্ত্বটি ধর্মের সাথে সংশ্লিষ্ট। পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্মের আধ্যাত্নিক সাধক এবং দার্শনিকদের মধ্যে ঈশ্বর-বিষয়ক একটা ধারণা আছে যার নাম, Panentheism। কেউ যেন আবার একে Pantheism এর সাথে মিলিয়ে ফেলবেন না। এই ধারণাটিকে নানাভাবে প্রকাশ করা হয়। তার মধ্যে একটা প্রকাশ এমন যে, “এই বিশ্বজগত ঈশ্বরের মনেরই একটা অংশ”। নিজ ধর্ম হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই জানার চেষ্টা করেছিলাম ইসলামে এমন কিছু আছে কিনা। ইসলামে সূফী সাধকদের মধ্যে কাছাকাছি ধরণের একটা তত্ত্ব আছে যার নাম “ওয়াহদাতুল উজুদ” বা অস্তিত্বের এককত্ব(বলে রাখা ভাল এখানে আমি শাব্দিক অর্থ বুঝাচ্ছি না)। এখানেও বলা হয়- একমাত্র আল্লাহ তায়ালার অস্তিত্বই প্রকৃত বা পরম। আর বাকী সমস্ত কিছুর অস্তিত্ব হল অপ্রকৃত। আমাদের এই বিশ্বজগতের অস্তিত্ব প্রকৃত নয়, এটা ক্ষণস্থায়ী। আর এই বিশ্বজগত এবং এর অন্তর্গত সমস্ত কিছু আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছা বা হুকুমেরই প্রকাশ মাত্র। সে হিসেবে এই জগত আমাদের কাছে তাঁর অর্থাৎ প্রকৃত অস্তিত্বের ছায়ার মত। ছায়া যেমন প্রকৃত কায়া থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়েও তার কিছু বৈশিষ্ট্যকে প্রকাশ করে, অনেকটা সেরকম। আর সূফী সাধনার চরম স্তর হল, এই ক্ষণস্থায়ীর অস্তিত্বকে পুরোপুরি ভুলে যেয়ে একক হিসেবে শুধু আল্লাহ তায়ালার পরম অস্তিত্বকে অনুভব করা। যার প্রথম ধাপ হল, নিজের প্রবৃত্তি বা ইন্দ্রিয়কে দমন করা বা জয় করা। এই সিরিজের একদম শুরুতেই ইন্দ্রিয়ের কথা বলেছিলাম মনে আছে?

এই পোস্টটি যখন লেখা শুরু করেছিলাম, তখন এতকিছু লেখার পরিকল্পনা ছিল না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অনেক কিছুই লিখে ফেললাম। আর এই সিরিজটা লিখতে গিয়ে নতুন অনেক কিছু পড়েছি, নতুন অনেক কিছু শিখেছি, অনেক কিছু নতুনভাবে ভাবতেও শিখেছি। এমন কিছু লিখতেও ভাল লাগে। অনেকের অনেক মন্তব্য এব্যাপারে আমাকে উৎসাহ যুগিয়েছে। অনেক ধন্যবাদ সবাইকে। আর ধন্যবাদ দেব দার্শনিকদের আর তাঁদের বিকল্প চিন্তাধারাকে। এই সিরিজের বিষয় নিয়ে আরও জানতে মূল প্রবন্ধে দেওয়া লিংকগুলো ছাড়াও দেখতে পারেন উইকিপিডিয়ার এই লিংক দুটি এবং এদের থেকে বের হওয়া আরও অনেক লিংকের জাল-

http://en.wikipedia.org/wiki/Simulated_reality
http://en.wikipedia.org/wiki/Simulism

১,৬৭২ বার দেখা হয়েছে

৯ টি মন্তব্য : “আমাদের অস্তিত্ব – শেষ পর্ব”

  1. ফয়েজ (৮৭-৯৩)

    একটা সাইন্স-ফিকশন লিখলে কেমন হয়, দুই দল রোবট, একদলের মন আছে, আরেক দলের মন নেই, এর পরে লাগলো গ্যাঞ্জাম, চিপার মধ্যে পড়লো মানুষও। এর পরে মনে কর লজিকে বাগ বা ভাইরাস ধরল, মন ছাড়া রোবটের লজিক গেল উল্টায়, আর মন সহ রোবটের লজিক পুরাই বরবাদ, মন ছাড়া আর কিছুই নাই,

    কেমন হয়? প্লটটা কিন্তু দারুন।


    পালটে দেবার স্বপ্ন আমার এখনও গেল না

    জবাব দিন
  2. মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)

    গুলশান,
    খুব ভালো লেগেছে তোমার লেখার বিষয়বস্তু এবং ধরণ। এখান থেকে 'পাওয়ার অব এবষ্ট্রাকশন' এর প্রয়োজনীয়তাটা আবার উপলব্ধি করলাম।


    There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

    জবাব দিন

মওন্তব্য করুন : ফয়েজ (৮৭-৯৩)

জবাব দিতে না চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।