সাগর বেলায়

শেষ বিকেলে সাগর তীরে ভেজা বালির উপর হাঁটছি। পেছনে ঝাউবন আর পাহাড় সবুজ বনানীতে আচ্ছন্ন। সূর্য ডোবার পালায় মেঘ মুক্ত আকাশে রঙের খেলা। কোলাহল থেমে গেছে। এক প্রবীন ভারতীয় দম্পতি তখনো লম্বা চেয়ারে বসে। ভদ্রলোকের মনোযোগ হাতের চৌকশ যন্ত্রে। হয়তো কিছু লিখছেন। জীবনের শেষ বেলা এই সাগর বেলায় সূর্য ডোবার ক্ষনে সমান্তরাল কোন উপলব্ধি। মহাশয়ার ব্যাস্ততা ভিন্ন মাত্রায়। বিশাল হাতব্যাগের ভেতরে কিছু খুঁজছেন, বিরক্তির আভিব্যাক্তি স্পষ্ট। খানিক দূরে নব প্রজন্ম প্রজন্মের ব্যাবধান রক্ষা করছে। অন্য দিকে চোখ ফেরাই। সূর্য তার অমোঘ গন্তব্যের বেশ কাছে চলে এসেছে। ওদিকে আরো একটি আনন্দময় সন্ধ্যার আয়োজন চলছে। বড় লোহার ঝাঁজরিতে কাঠকয়লা সাজিয়ে আগুন জ্বালানো হচ্ছে। খানিক পর ঝলসানো মাংসের ঘ্রানে মাতিয়ে তুলবে চরাচর। আর সমুদ্রের আছড়ে পড়া আকুতির সাথে মিশে যাবে গীটারের সুর। বেশ খানিক পর আবারো সেই প্রবীন দম্পতির দিকে চোখ ফেরাই। মহাশয়ার অনুসন্ধান পর্ব তখনো শেষ হয়নি। ওই হাতব্যাগ যেন সামনের ওই সমুদ্রের মতই গভীর অনন্ত রহস্যের আধার। আলো আঁধারের সেই মহেন্দ্রক্ষনে নব প্রজন্মের চেতনায় মূহুর্তটিকে ধরে রাখার ব্যকুলতা দেখা গেল। অদৃশ্যপ্রায় সূর্যকে পশ্চাদভূমি করে চলল আলোকচিত্র ধারনের প্রয়াস। চকিতে আমারো মনে পড়ে যায় নিজস্ব কিছু বেদনার ইতিহাস। প্রিয়তম গুরুজনদের ছবি এভাবেই যেন চলে যাবার ঠিক আগে ধরে রাখা হয়েছিল।

সুর্য ডুবে গেছে। সামনের আকাশ এখনো তার স্মৃতিতে রঙ্গীন। পেছনে ঝাউবনে নেমে আসছে আরণ্যক আঁধার। আর ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক যেন অরণ্যের নিজস্ব ভাষা। দূরে বন্দরের আলো তরঙ্গমালায় খেলা করে। খানিক পর জোনাকীরা আসে সেই আলোর মেলায় কোমল গান্ধার হয়ে।

রাত গভীর হয়। ঘুম নেই চোখে। পায়ে পায়ে আবারো আসি নির্জন সাগর তীরে। রাতের নৈঃশব্দে তরঙ্গভঙ্গ আরও উচ্চকিত হয়। ঢেউয়ের আছড়ে পড়ার শব্দ কেন জানিনা কেমন দীর্ঘশ্বাসের মত শোনায়। সমুদ্র নদী এরা কি কথা বলে! “কাঁদো নদী কাঁদো” উপন্যাসে যেমন নদী ঘেরা এক জনপদের মানুষ নদীর কান্না শুনেছিল। সমুদ্র বহু প্রাচীন। হাজারো সাম্রাজ্যের উত্থান পতনের সাক্ষী। তেমনই জানে সে অগনন মানুষের বুকের ভাঙ্গা গড়ার আদি অন্তহীন ইতিহাস। অথবা এই অনন্ত সিন্ধুর এক সামান্য ঢেউ যেন আমি, কোন এক অলৌকিক বালিয়ড়ির বুকে আছড়ে পড়বো একদিন। ভেজা বালিতে পায়ের ছাপ সে তো থাকে কয়েক মূহুর্ত মাত্র। এই কথাই হয়তো সমুদ্র বলতে চাইছে এখন। ওদিকে চেতনা বিবশ করা এক চাঁদ পাহাড়ের আড়াল থেকে উঠে আসছে। সমুদ্র আকাশ অরণ্য চাঁদ সবাই মিলে এই মাটির পৃথিবীকে নিয়ে এখুনি যাবে এক পরাবাস্তব জগতে। সইবে না- এতটা সইবে না। আমি গৃহত্যাগী সন্ন্যাসী নই। তাই, ভেতরের বাস্তুমাটির প্রবল আকর্ষনে ঘোর লাগা অবস্থায় ফিরে আসি পায়ে পায়ে।

৬৫১ বার দেখা হয়েছে

৪ টি মন্তব্য : “সাগর বেলায়”

মওন্তব্য করুন : খায়রুল আহসান (৬৭-৭৩)

জবাব দিতে না চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।