খেরোখাতা – কাঁচা হলুদ রোদ এবং আমার কবিতারা

১।
পরের দিন সকালে বাসে চড়তে হবে বলে, আর দুপুরে আমাদের রাস্তায় খেতে হবে বলে রাত জেগে মা খাবার তৈরী করেন। বাবার হাঁক-ডাকে সক্কাল বেলায় উঠে আধো ঘুমেই আমরা জামা কাপড় পরে তৈরী হয়ে নেই। নয়টা সাড়ে নয়টার বাস ধরতে পারলেও লাল-দিঘী নামতে নামতে দুপুর সাড়ে বারো বা একটা বেজে যায়। লাল –দিঘীর হাটে গরু অথবা মহিষের গাড়ি অপেক্ষায় থাকে, আর সাথে থাকে সদা হাস্যময় প্রিয় খলিল চাচা। পুকুরের পানিতে একটু হাত মুখ ধুয়ে, চড়ে বসি গরুর গাড়িতে। গাড়ি চলে মান্দার গাছের পাশ ঘেসে, মেঠো রাস্তা দিয়ে। দাদু বাড়ি পৌছে যাই বিকেল বেলাতেই । খুব বেশি দেরী হলে হয়ত দেখা যায় মুয়াজ্জিন চাচা মাগরিবের আজানের জন্য অজু করছেন মসজিদের বারান্দায়।

দাদু বাড়ি থেকে অবশ্য অবশ্যই আম্মা যাবেন নানু বাড়িতে, এবার ফজরের নামাজ শেষ হতে হতেই উঠতে হত গরু গাড়িতে। চারিদিকে তখনো অন্ধকার। আমরা গাড়িতে উঠে আবার ঘুমিয়ে পড়তাম, একটু পরে নাস্তা করে রাস্তায় নেমে বুনো ফুলের মধু খেয়ে গাড়ির পাশে পাশে হাটতাম খানিকক্ষন। খলিল ভাই মাঝে মাঝে গরুর পিঠে উঠিয়ে দিতেন। আমরা চলতাম, দুপুরের খাবার খেতাম, গরু গুলোকে একটু বিশ্রাম দেয়া হত কোন গাছের তলায় ছেড়ে দিয়ে, ওরা ঘাস চিবুতো কিছুক্ষন, এর পর আবার পথ চলা, আবার একটু ঘুম, আবার একটু হেটে বেড়ানো। সূর্য্য ডুবে যাবার আগেই হয়তো পৌছে যেতাম নানু বাড়ি। হারিয়ে যেতাম সাথে সাথেই আধা-ডজন মামাতো ভাই-বোনের মাঝে। সারা বাড়ি জুড়ে চিৎকার চেঁচামেচি। হারিকেনের আলোতে আমাদের খুব জমে উঠত চোর-ডাকু-বাবু-পুলিশ খেলা।

এখনো দাদু বাড়ি নানু বাড়ি যাই। দাদা-দাদী-নানা-নানী-বাবা-মা কেউই আর বেঁচে নেই। রাস্তা গুলো সব পাকা হয়ে গিয়েছে। গরুর গাড়িও নেই আর। সকাল বেলা নাস্তা করে অন্য রকম এক গাড়িতে উঠি, দুপুর বেলা নানুর বাড়িতে দুপুরে খাবার, রাতের বেলা দাদুর বাড়িতে রাতের খাবার খেয়ে, সবার সংগে বেশ একটু জমিয়ে আড্ডা দিয়ে রাত বারোটা বাজার আগেই বেশ ফিরে আসি রংপুরের বাসায়।

এখনকার দিনগুলো বড্ড বেশি লম্বা লাগে, ফুরুতেই চায় না যেন।

২।
কোচঁড় ভর্তি করে কাচাঁমিঠা আম নিয়ে গিয়েছিলাম বলে পারুদি আমাকে একদম বুকের ভিতর পর্যন্ত টেনে নিয়েছিল। আজঁলা ভর্তি করে বকুল ফুল নিয়ে হাজির হয়েছিলাম ময়না ‘পুর বাসায়, বেদম শীতের সকালে। ঠান্ডায় ঠক ঠক করে কাঁপছি দেখে ময়না ‘পু ফুল নয়, আমাকেই জড়িয়ে ধরে গালে গাল ঠেকিয়ে রেখেছিলেন অনেকক্ষন, বুকের ধুকপুকানি না কমা পর্যন্ত। বড় হয়ে গিয়েছি বলে বেশ বড়াই করেছিলাম মিতা ‘পুর কাছে, হাতের পেশী ফুলিয়ে ফুলিয়ে। “দেখি তো আমাকে কোলে করে সারা আঙ্গিনা ঘুরতে পারিস নাকি তুই” মিতা ‘পুর এই আবদার শুনে লজ্জায় সেই যে পালিয়েছিলাম তার বাসা থেকে, করমচার আচার খাওয়াবে বলে প্রতিজ্ঞা না করা পর্যন্ত গোটা একটি দিন আর সেদিকে যাইনি। সিথি আপুকে পাহাড়া দিতে বলে খালামনি গিয়েছিলেন ছোটন কে স্কুল থেকে আনতে, “ওরে আমার গার্ডিয়ান রে” থুতনি নেড়ে বলে উঠেছিল সিঁথি আপু, মুচকি হাসি দিয়ে।

আমি ছিপ দিয়ে কাঁচা হলুদের রংকে তুলে আনি অবিরত, কুঁড়িয়ে আনি দখিনা বাতাসে উড়ে চলা শিমুলের তুলো, আমার অনেকগুলো বিকেল কেটে যায় সূতো ছেঁড়া ঘুড়ির পিছনে দৌঁড়িয়ে দৌঁড়িয়ে, আমার অনেকগুলো সন্ধ্যে কেটে যায় রাত করে বাড়ি ফিরতে গিয়ে, বাবার বকুনির ভয়ে, টিউবয়েলের পাশ দিয়ে পা টিপে টিপে হাটতে গিয়ে। খুশি মোহন স্যারের বেতের মারের জ্বলুনী কমে যাওয়ার আগেই হুমকি দিয়ে বসি স্যারকে, “বাসায় গিয়ে ঠিক ঠিক বাবাকে বলে দেব”।

আমি দল বেঁধে কাঠালের মুচিতে লবন আর কাচামরিচে ভর্তা লাগাই, আমি কার্দমাক্ত মাঠে লুকিয়ে থাকা শিং মাছ খুঁজি, আমার হাতে কাটা বিঁধে, ব্যাথায় কাতরাই সারা-রাত। সকাল হলেই আবার আমি ছুটে যাই গড়ের মাঠে, নাম না জানা বিশাল পাখিটির বাসা দেখতে।

মায়ের বুকের ঘ্রান নিতে নিতে কেটে যায় আমার অনেক গুলো রাত।

পরদিন সকালে আমরা মেহেদী বেটে হাতে লাগাই, উৎসবে মাতবো বলে। মেয়েদের আবার সবকিছুতেই বাড়াবাড়ি, আমাকে তারা কিছুতেই হাতের পাঁচ আংগুলে মেহেদী দিতে দেয় না, আমি পুরুষ বলে। তারা কনূই ডুবিয়ে রঙ করে, তারা মেয়ে বলে।

আমি সব দুঃখ-অভিমান-ভালোবাসা গুলো আলতো করে সাজিয়ে রাখি আমার লাল মলাটের খাতায়।

৪,৬১৩ বার দেখা হয়েছে

৭৪ টি মন্তব্য : “খেরোখাতা – কাঁচা হলুদ রোদ এবং আমার কবিতারা”

  1. শাহরিয়ার (২০০৪-২০১০)
    আমি ছিপ দিয়ে কাঁচা হলুদের রংকে তুলে আনি অবিরত, কুঁড়িয়ে আনি দখিনা বাতাসে উড়ে চলা শিমুলের তুলো, আমার অনেকগুলো বিকেল কেটে যায় সূতো ছেঁড়া ঘুড়ির পিছনে দৌঁড়িয়ে দৌঁড়িয়ে, আমার অনেকগুলো সন্ধ্যে কেটে যায় রাত করে বাড়ি ফিরতে গিয়ে, বাবার বকুনির ভয়ে, টিউবয়েলের পাশ দিয়ে পা টিপে টিপে হাটতে গিয়ে

    কেবল দুঃখ জাগায়,বেদনা জাগাতে চায়!তীব্রতম কষ্ট...সব কিছু যেন হারিয়ে যেতেছে...সর্বদা অনুভব করি...বড় হয়ে যাচ্ছি আর অসহায় হয়ে পড়ছি ক্রমশ!অপরাজিত পড়ার পর যে কষ্ট পেয়েছিলাম,আজকে আবার পেলাম... :salute: :salute:


    People sleep peaceably in their beds at night only because rough men stand ready to do violence on their behalf.

    জবাব দিন
  2. রকিব (০১-০৭)
    আমি সব দুঃখ-অভিমান-ভালোবাসা গুলো আলতো করে সাজিয়ে রাখি আমার লাল মলাটের খাতায়।

    খেরোখাতা বরাবরের মতোই দারুন। ফয়েজ ভাই ড়ক করে।


    আমি তবু বলি:
    এখনো যে কটা দিন বেঁচে আছি সূর্যে সূর্যে চলি ..

    জবাব দিন
  3. কামরুল হাসান (৯৪-০০)

    আপনার ছোটবেলায় খালি আপু আর আপু।
    আপনার মতো হইলে আমি আর বড়ই হইতাম না। সারাজীবন ছোট থাইকা যাইতাম। :grr:


    ---------------------------------------------------------------------------
    বালক জানে না তো কতোটা হেঁটে এলে
    ফেরার পথ নেই, থাকে না কোনো কালে।।

    জবাব দিন
  4. রকিবুল ইসলাম (৯৯-০৫)

    বরাবরের মতোই অসাধারন। :salute:
    অনেকদিন পরে লিখলেন মনে হলো
    তবে আমারও এক্টাই কথা কামরুল ভাই এর মতো

    আপনার ছোটবেলায় খালি আপু আর আপু।
    আপনার মতো হইলে আমি আর বড়ই হইতাম না। সারাজীবন ছোট থাইকা যাইতাম।
    জবাব দিন
  5. এহসান (৮৯-৯৫)
    অনেকদিন পড়ে লিখিনি রে ভাই, অল্প দিন পড়েই লিখেছি।

    ফজু ভাই বহু দিন পর ভালো লেখা লিখলেন। ঈদে সফরজনিত ক্লান্তি কিংবা বাসের জ্যামের অবসর আপনার জন্য ভালো টোটকা হিসেবে কাজ করেছে। বহুদিন পর রক করলেন ভাই। বেশ ভালো লাগলো।

    তপুর মত আপনিও দেখি বেশ ভাগ্যবান।

    জবাব দিন
    • ফয়েজ (৮৭-৯৩)

      ভাইরে আপুদের আদরের কথাই শুধু কইছি, এদের বকার কথা তো কই নাই।

      দাদু বাড়িতে ঈদের বা আমের ছুটি খুব জমত। এ বাড়ি ও বাড়ি মিলে একগাদা ভাইবোন, মিনিমাম ২৫/৩০ হবেই। এখন সবাই মোটামুটি বুড়ো বুড়ি হয়ে গেছি। মারাও গেছেন দুয়েক জন। আমি আবার এদের সবার মোটামুটি ছোট। মানে হচ্ছে আমরা দুইতিন ছিলাম একবছর এদিক ওদিক, সেই অর্থে সবার ছোট।


      পালটে দেবার স্বপ্ন আমার এখনও গেল না

      জবাব দিন
  6. মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)

    "কামরুলের সঙ্গে তীব্র সহমত। ফয়েজ এত্তো আপু পায় কৈ? এক তপু হা হুতাশ কইরা মরে, আর ফয়েজ এখনো খালি আপুদের গল্পই করে!!

    খেরোখাতা যথারীতি দারুণ। এক একটা ছোট গল্প। কামরুলের নাটকের জন্য অসাধারণ সব স্ক্রিপ্ট। অনেকদিন পর লিখলা! নাহ্ আমিই তো অনিয়মিত হয়ে আছি।
    চালিয়ে যাও।"-


    There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

    জবাব দিন
  7. মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)

    কামরুলের সঙ্গে তীব্র সহমত। ফয়েজ ভাই এত্তো আপু পায় কৈ? এক তপু হা হুতাশ কইরা মরে, আর ফয়েজ ভাই এখনো খালি আপুদের গল্পই করে!!

    খেরোখাতা যথারীতি দারুণ। এক একটা ছোট গল্প। কামরুলের নাটকের জন্য অসাধারণ সব স্ক্রিপ্ট।


    There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

    জবাব দিন
  8. রবিন (৯৪-০০/ককক)
    কামরুলের সঙ্গে তীব্র সহমত। ফয়েজ ভাই এত্তো আপু পায় কৈ? এক তপু হা হুতাশ কইরা মরে, আর ফয়েজ ভাই এখনো খালি আপুদের গল্পই করে!!

    খেরোখাতা যথারীতি দারুণ। এক একটা ছোট গল্প। কামরুলের নাটকের জন্য অসাধারণ সব স্ক্রিপ্ট।

    ভাইয়া, অনেক বড় লেখা দিলেন

    জবাব দিন
  9. আহসান আকাশ (৯৬-০২)

    খেরোখাতা পাথরায় :hatsoff: :hatsoff: :hatsoff:

    ( এই লেখা পড়ার সময় আমার শুধু কামতপুর কথা মনে হচ্ছিল 🙂 )


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন
  10. মহিব (৯৯-০৫)
    আমি ছিপ দিয়ে কাঁচা হলুদের রংকে তুলে আনি অবিরত, কুঁড়িয়ে আনি দখিনা বাতাসে উড়ে চলা শিমুলের তুলো, আমার অনেকগুলো বিকেল কেটে যায় সূতো ছেঁড়া ঘুড়ির পিছনে দৌঁড়িয়ে দৌঁড়িয়ে, আমার অনেকগুলো সন্ধ্যে কেটে যায় রাত করে বাড়ি ফিরতে গিয়ে, বাবার বকুনির ভয়ে, টিউবয়েলের পাশ দিয়ে পা টিপে টিপে হাটতে গিয়ে। খুশি মোহন স্যারের বেতের মারের জ্বলুনী কমে যাওয়ার আগেই হুমকি দিয়ে বসি স্যারকে, “বাসায় গিয়ে ঠিক ঠিক বাবাকে বলে দেব”।

    এই লাইনগুলা খুব ভালো লাগলো৷ পুরা লেখাটাই কেমন যেন! মন খারাপ করা৷ 🙁

    ফয়েজ ভাই, চিটাগাংএ বেকার বইসা আছি৷

    চাকরি চাই৷ 😀

    জবাব দিন
  11. পাভেল (১৯৯৩-৯৯)

    সেকেন্ড পার্টটা অসাধারণ লাগলো ফয়েজ ভাই। পথের পাচালীর অপুর মতো। অনেক কিছু মনে পড়ে মনটা খারাপ হয়ে গেল। বড় হয়ে লাইফে লস্ই বেশী হয়ে গেল লাভের চাইতে 🙁

    জবাব দিন
  12. আহমদ (৮৮-৯৪)
    দাদু বাড়িতে ঈদের বা আমের ছুটি খুব জমত। এ বাড়ি ও বাড়ি মিলে একগাদা ভাইবোন, মিনিমাম ২৫/৩০ হবেই। এখন সবাই মোটামুটি বুড়ো বুড়ি হয়ে গেছি। মারাও গেছেন দুয়েক জন। আমি আবার এদের সবার মোটামুটি ছোট। মানে হচ্ছে আমরা দুইতিন ছিলাম একবছর এদিক ওদিক, সেই অর্থে সবার ছোট।

    ফয়েজ ভাই ... দারুন লেখা ... আহারে ... আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম ...


    চ্যারিটি বিগিনস এট হোম

    জবাব দিন

মওন্তব্য করুন : ফয়েজ (৮৭-৯৩)

জবাব দিতে না চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।