অন্তরালে ১

১) পরদিন সকালে অ্যাথলেটিক্স প্রতিযোগিতা শুরু হবে। সকালের প্যারেড শেষে কলেজের প্রত্যেকটি ক্যাডেট খুব ব্যস্ত। যারা অ্যাথলেট তারা নিজের ইভেন্ট নিয়ে ব্যস্ত। ক্লাস টুয়েলভ হাউস চ্যাম্পিয়নশিপের জটিল সমীকরণের সহজতম সমাধান ও তার বিকল্প খোঁজা নিয়ে ব্যস্ত। ইলেভেন আসন্ন জুনিয়র প্রিফেক্টশিপ আর নিজের সম্ভাবনা নিয়ে নানান বাস্তব-অবাস্তব কল্পনায় ব্যস্ত। হাউস টেন্টের আড়ালে কিংবা পোল-ভল্টের প্রকাণ্ড ফোমে শুয়ে বসে টেস্ট পেপার হাতে ‘অবজেক্টিভ সলভ’ করায় ব্যস্ত এস এস সি ক্যান্ডিডেটরা। ক্লাস নাইনের হাতে হাতে গল্পের বই। কড়ি দিয়ে কিনলাম, লোটাকম্বল, গর্ভধারিণী, আট কুঠুরি নয় দরজা, উত্তরাধিকার। বেশি ভাগ্যবানদের হাতে হয়তো হলুদ হিমু কালো র‍্যাব কিংবা হুমায়ূন আহমেদের যে কোনো বই। ক্লাস এইট ব্যস্ত জুনিয়রদের নিয়ে। তাদের কাজ কলেজের মাটিতে ক্লাস সেভেনের প্রথম অ্যাথলেটিক্স অভিজ্ঞতায় বিষ ঢালা আর গত বছরের নিজেদের একই দুর্দশা বহুগুণে ফিরিয়ে দেয়া। সেভেনের নিজেদের কোনো ব্যস্ততা নেই ক্লাস এইটের অকৃত্রিম আন্তরিকতায়। শুধু ফাইনাল ডে তে বাবা-মার সাথে সময় কাটানোর অপেক্ষা আর সিনিয়রদের থেকে সদা একশ হাত দূরে থাকার নিষ্ফল প্রচেষ্টা।

কোনো এক বছর হিজিবিজি শিডিউল আর কিছু অতি চালাক ক্যাডেটের কারণে অ্যাথলেটিক্স শুরুর আগের দিনেই আরেকটা ইভেন্ট হয়। প্রিন্সিপাল’স প্যারেড! গোঁদের ওপর বিষফোঁড়া। কলেজে এই প্যারেডটাই ছিল সবচেয়ে বিরক্তিকর। খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি। প্রতি টার্মে একটা করে প্যারেড। বছরে মোট তিনটা। কিন্তু সবমিলিয়ে পয়েন্ট মোটে ২ ! আর ট্রফিটা তো আরও বাজে। পিতলের একটা মদের গ্লাসের মতন ! নভিসেস প্যারেড আর ড্রিল কম্পিটিশনের জৌলুসে এই প্যারেডের অবস্থা ছিল চিড়িয়াখানায় দু’পাশের বাঘ-সিংহের খাঁচার মাঝে রাখা খেঁকশিয়ালের মতন।

ডিসেম্বরের কোনো এক অন্ধকার ভোরে গ্রাউন্ডসম্যান আফজাল ভাইয়ের ব্যস্ততা শুরু হয়। ঘড়িতে সময় তখন সাড়ে চারটা। প্রত্যেক হাউসে গিয়ে ক্যাডেটদের সাজ সরঞ্জাম ঠিকঠাক বুঝিয়ে দেন প্রথমেই। তারপর পতাকাবাহী দলের দুনিয়ার ঝামেলার জিনিস! নতুন ফ্ল্যাগ, লাল স্ল্যাশ, হাতমোজা, উইকেটকিপিং প্যাডের মতো সাদা জিনিসটা (নাম ভুলে গেছি) ইত্যাদি। এবার প্যারেড গ্রাউণ্ড রেডি করা। দশ ফুট অন্তর লাল নীল বেগুনি পতাকা টাঙানো, ফুলের টব বসানো, প্রিন্সিপালের জন্য মঞ্চ বানিয়ে তাতে লাল গালিচা বিছানো ছাড়াও আরও কতো কতো কাজ। সাড়ে সাতটা নাগাদ প্যারেড শেষ হলে সব জিনিস গুছিয়ে স্টোরে পাঠানোর কাজটাও উনার। সেখান থেকে সোজা অ্যাথলেটিক্স গ্রাউণ্ড। এরপর একটানা খেটে যাওয়া। ৪০০ মিটার ট্র্যাকের আশেপাশে কাজের খনি লুকিয়ে থাকে। সে হিসাব দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। ক্যাডেটমাত্রই এটি জানে। প্রায় মাস খানেক ধরে অ্যাথলেটিক্সের এই প্রস্তুতি চলে। তবে শেষদিনের কাজ আর শেষ হবার নয়। সন্ধ্যা নামলে লাইট জ্বালিয়ে কাজ চলে। আমরা টি ভি রুমে হইচই করে ম্যুভি দেখি। আফজাল ভাইদের কাজ চলে। পৌনে এগারোটায় লাইটস অফ। আমরা কম্বলের উষ্ণতায় দিনের ইতি টানি। আফজাল ভাইদের কাজ চলে। আমরা কেউ কেউ জেগে থাকি, আড্ডা দেই, মজা করি। আফজাল ভাইদের কাজ চলতেই থাকে। কুয়াশা বাড়ে। আমরা তীক্ষ্ণ চোখে দূরের অ্যাথলেটিক্স গ্রাউন্ডে আলো দেখি। মানুষের নড়াচড়া দেখি। কুয়াশা বাড়তেই থাকে। একসময় আমরা শুধুই কুয়াশা দেখি। প্রায় দেখতে না পাওয়ার মতন বাতির আলো দেখি। কিন্তু কারো নড়াচড়া দেখিনা। কারণ এই আলো আফজাল ভাইয়ের অস্তিত্ব বোঝানোর জন্য যথেষ্ট নয়।

 

২) মাস দুয়েক আগে একদিন লাঞ্চের ঘটনা। মেন্যু ছিল মাছ। ভাত খাওয়া শুরু করে মাছের টুকরাটা ভাঙলাম। এবার আঙুলে টিপে কাঁটা বাছতে গিয়ে আমি পুরাই বেকুব! মাছটা আমার দুর্বল তর্জনী আর বুড়ো আঙুলের চাপে মিহি ক্রিমের মতন একদম গলে গেলো! নিজেকে বললাম, আরে মাছ তো তাজাই, কোনো অসুখ হয়েছিল হয়তো। বাবুর্চি সাহেব আসলেন। এপিঠ ওপিঠ উল্টে বললেন, দুই পাশই তো ভাজা হইসে, আমার কাজ আমি করসি। এবার আরো সিনিয়র (ফৌজি) একজন আসলেন। মাছটা নাকের কাছে নিয়ে দাঁত কেলিয়ে বললেন, স্টাফ পচে নাই তো !

কলেজ জীবনের দুই সহোদর অশোক ভাই-অসীম ভাইয়ের কথা মনে পড়ে প্রায়ই। তাঁরা ছিলেন আমাদের ডাইনিং এর সাপ্লায়ার। ছয় বছর ধরে দেখেছি ক্যাডেটদের জন্য তাঁরা বাজারের সবচেয়ে ভালো জিনিসটা আনতেন। অথচ কলেজকে দিতেন সাধারণের তুলনায় কম দামে। পরিমাণেও বেশি দিতেন মাঝে মাঝে। এতকিছুর পরেও সামান্য এদিক ওদিক হলেই ডিউটি মাস্টারের শাসানি জুটতো কপালে। একবার ডিউটি ক্যাডেট থাকা অবস্থায় আমি নিজের সামনে এমন ঘটনা দেখেছি। অশোক ভাইয়ের চোখেমুখে লজ্জা আর কষ্টের স্পষ্ট দৃশ্যটা এখনো আমার পরিস্কার মনে পড়ে। ক্যাডেটদের জন্য তাঁদের মমতা তাঁরা প্রকাশ করতে চাইতেন না। কিন্তু আমরা ঠিকই বুঝতে পারতাম। আপনাদের কথা আমরা ভুলে যাইনি। আপনাদের জন্য আমরা জেসিসির ছেলেরাও জমিয়ে রেখেছি অনেক শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা।

 

১,১০৬ বার দেখা হয়েছে

১২ টি মন্তব্য : “অন্তরালে ১”

  1. রকিব (০১-০৭)

    আফজাল ভাই, অশোক ভাই, হাউসের পাশের ঘাস কাটিয়ে আবদুর রহমান ভাই; হাউস বেয়ারা দেলোয়ার ভাইদ্বয়- এই মানুষগুলোর সাথে আমাদের কোন রক্তের সম্পর্ক ছিল না; অথচ দারুণ একটা মমতায় আটকে রাখতেন। ডাইনিং হলের বাটলার ছিলেন যিনি (নাম মনে করতে পারছি না); কিংবা অন্য সব ডাইনিং হল বেয়ারা যে ভাইয়ের ছিলেন- এদের হাতেই ছয়টা বছর বলা যায় বেড়ে উঠেছি। হাউস বেয়ারা দেলোয়ার ভাইয়ের সাথে একবার তুচ্ছ কারণে বেশ চড়া গলায় কথা বলেছিলাম; ঐ একবারই, তাছাড়া অন্তত বয়সে বড় কারো সাথে বাজে আচরণ করেছি বলে মনে পড়ে না। তারপরো ঐ একবারের জন্যই এখন ভয়াবহ রকমের লজ্জা পাই, একটা অপরাধ বোধ কাজ করে নিজের মধ্যেই।

    ক্লাশ সেভেন-এইট নাইনে নাম ধরেই ডাকতেন দাঁড়ি দেলোয়ার ভাই আমাদের। হঠাৎ করেই ক্লাশ টুয়েলভে ওঠার পর রকিব ভাই বলে ডাকা শুরু করায় আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম হঠাৎ ভাই বলতেছেন কেন। হেঁসে দিয়ে বলেছিলেন, আপনারা তো বড় হয়ে যাচ্ছেন; কয়দিন পর বড় অফিসার হবেন। দেলোয়াড় হাউস বেয়ারাই থেকে যাবে, খুব বেশি অফিসের আর্দালী। তখন হয়তো স্যার বলতেও হতে পারে। ভীষন হেসেছিলাম কথা শুনে সেদিন; আজকে মনে হয়- সেটা হয়তো বিষণ্ন উচ্চারণ ছিল।
    ভালো থাকুক এই মানুষগুলো। সবসময়।

    লেখাটা আরেকটু টানতে ভাই। ছুঁয়ে গেল।


    আমি তবু বলি:
    এখনো যে কটা দিন বেঁচে আছি সূর্যে সূর্যে চলি ..

    জবাব দিন
  2. ফেরদৌস জামান রিফাত (ঝকক/২০০৪-২০১০)

    কলেজে থাকতে না বুঝেই কতবার উনাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করেছি 🙁
    এখন মাফ চাইতে খুব ইচ্ছা করে


    যে জীবন ফড়িঙের দোয়েলের- মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা

    জবাব দিন
  3. ফেরদৌস জামান রিফাত (ঝকক/২০০৪-২০১০)

    কলেজে থাকতে না বুঝেই কতবার উনাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করেছি 🙁
    এখন মাফ চাইতে খুব ইচ্ছা করে 🙁


    যে জীবন ফড়িঙের দোয়েলের- মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা

    জবাব দিন

মওন্তব্য করুন : মোজাহার (ঝ.ক.ক./২০০৪-২০১০)

জবাব দিতে না চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।