শেষ অণুগল্প

হাসপাতাল তা সে যতই ‘নিট এন্ড ক্লিন’ থাকুক না কেন, মৃত্যুর এক ঘ্রাণে এর আবহ সবসময়েই উদ্দীপ্ত থাকে। বিভিন্ন ধরণের ঔষধ, ডিটারজেন্ট-ফিনাইল সহযোগে ঘ্রাণেরা নিজেদের ভেতরে এক ‘ফ্রি-স্টাইল’ কুস্তির মহড়া দিতে থাকে… দর্শণার্থীদের নাসারন্ধ্রে থেকে থেকে নিজেদের জাহির করার দ্বারা।

খুশবু কেবিন নাম্বার ৩২১ এর সামনে দাঁড়িয়ে এই কথাগুলি-ই ভাবছিল। একটা বদ্ধ দরোজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ভেতরে অতি প্রিয় একজন মানুষ। যে ওকে এই পৃথিবীর আলো-বাতাস দেখিয়েছে।। তিল তিল করে সময়ের বুকের দুঃসময়ের ভেতর দিয়ে সময়কে অতিক্রম করা শিখিয়েছে.. নিজের মত করে চলতে সক্ষম করে তুলেছে। নিজের মত করে ভাবতে শিখিয়েছে… এজন্যই কি আজ সেই মানুষটির চলে যাবার মুহুর্তে সে ভাবনার জগতে ঘুরপাক খাচ্ছে? একটা বদ্ধ কেবিনের ভেতরে প্রবেশ করবার মত সাহসটুকুও তো বাবা ওকে এনে দিয়েছিলেন! তবে আজ কেন ভেতরে যেতে মন সায় দিচ্ছে না? শরীর মনের নির্দেশে চলে, সেটা আজ আবারও একবার খুশবু জেনে নিলো।

ওর ভাবনা-চিন্তা সব এলোমেলো হয় লম্বা করিডোর দিয়ে সাদা অ্যাপ্রোণ পরা একজন ডাক্তার সাথের নার্সের সাথে কথা বলতে বলতে হেঁটে আসায়। খুশবুকে পাশ কাটানোর সময় একবার নার্সটি ওর দিকে তাকায়। পরক্ষনেই ডাক্তারের কি এক প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বামে মোড় নিয়ে তারা ওর দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়। বড় করে একটা দম নিয়ে নিঃশ্বাসগুলি ততোধিক দ্রুততায় ছেড়ে দেয়। ভেতরের জটিল অণুভাবনাগুলিকেও বের করে দেবার চেষ্টাও একটু রয়ে যায় বুঝি। নিঃশব্দে কেবিনের দরজায় হাত রেখে খুশবু কেঁপে ওঠে।

ভেতরে সাদার এক ঝলক ওর দৃষ্টিকে আচ্ছন্ন করে ফেলে পলকের তরে। ধবধবে সাদা বিছানায় আরো সাদা একজন মানুষ শুয়ে আছেন। ভেতরের রক্ত সব, কিছু একটা শুষে নেয়াতেই ওর চোখে বাবা নামের এই প্রিয় মানুষটিকে এমনই লাগে। শুভ্রতায় শুভ্র হয়ে আছে যেন বিশ্বচরাচর! হৃদয়ের সকল রক্তিম আভাও শ্বেত-শুভ্রতায় আচ্ছন্ন। ব্লাড-ক্যান্সারে জীবনের শেষ প্রহরগুলি কাটাচ্ছেন সাদা চুল-দাড়িতে আবৃত একা একজন মানুষ। দেশের সবচেয়ে নামকরা হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের সকল প্রচেষ্টা হার মানতে চলেছে নিয়তির কাছে।
নিয়তি? কেন বাবারা নিয়তির কাছে হার মেনে চলেছেন.. একের পর এক.. বাবুদেরকে রেখে কেন চলে যেতে হবে কোনো বাবাকে?

ভাবতে ভাবতে নিজের অজান্তেই হয়ত মৃদু আক্ষেপ বের হয়েছিল খুশবুর ভেতর থেকে। সাউন্ডপ্রুফ কক্ষটিতে হয়তো হৃদয়ের অনবরত সংকোচন-প্রসারণে সৃষ্ট শব্দও শোনা যায়। বাবাও কি ওর হৃদয়ের কষ্টের তীব্রতর মৃদু ওয়েভ অনুভব করলেন? তাই কি চোখে মেলে তাকালেন?

ধীরে ধীরে বাবার বেডের পাশে গিয়ে আলতো করে বাবার হাতটি ধরে। এতটুকু ছুঁয়ে দেয়া কি জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা একজন একাকি পথচলা মানুষকে উজ্জীবিত করে তুলতে যথেষ্ট?
না?
তবে কেন বাবা হাসলেন! খুশবু স্পষ্ট দেখলো বাবার ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা সেই পরিচিত হাসি। বাবা ওকে দেখে বরাবরের মত উঠে বসতে চাইলেন। কিন্তু সেটা মনের চাওয়া। সব সময়ে মন শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।

একটু থমকে যায় খুশবু। ওর হাতের ভেতরে বাবার হাত হয়ে ওর হৃদয়ের টানাপোড়ন বাবার হৃদয়েও বুঝি পৌঁছে যায়। একটু আগেই না খুশবু ভেবেছে-জেনেছে মনের নির্দেশে শরীর সাড়া দেয়। তবে এখন কেন এই অনুভবে প্রবল হল ‘সব সময়ে মন শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না?’ এখানে ‘সবসময়’ শব্দটা ব্যবহার হয়েছে বলেই কি?

যান্ত্রিক বেডটির নির্দিষ্ট স্থানে প্রেস করিয়ে বাবাকে শোয়া থেকে ইজি পজিশনে নিয়ে আসে। কিছুক্ষণ দু’জন নীরবে নৈশব্দের অনুরণন উপভোগ করে। সময় যেন থামকে আছে। বাবা-ই নিরবতা ভঙ্গ করেন-
‘ কেমন আছিস মা আমার?’
– 🙂
মৃদু হেসে খুশবু বাবার প্রশ্নের উত্তর দেয়। অনেক সময় যেমন নীরবতা অনেক প্রশ্নের উত্তর হয়, কখনো কখনো হাসিও সুন্দর জবাব হয়ে ওঠে। অথবা যেগুলির কোনো উত্তর হয় না, সে ক্ষেত্রে হাসি এবং নীরবতা না বলেও অনেক কিছু বুঝিয়ে দেয় যেন।
‘ আমার নানা ভাইয়েরা কেমন আছে?’
– ভালো আছে ওরা।

আবার চুপ হয়ে যান বাবা। কিন্তু খুশবুর আরো কিছু প্রশ্ন শুনতে ইচ্ছে করে। বাবা ওর কথা জানতে চাইলেন.. ইফতি ইফাদের কথা জিজ্ঞেস করলেন… কিন্তু বাবা আর কারো কথা জানতে চাইলেন না! সেই বরাবরের মত এখনো একই রয়ে গেছেন বাবা। শিহাবের কথা কেন জানতে চাইলেন না বাবা?

‘তুমি কি মনে করেছিলে বাবা তাঁর শেষ সময়ে পালটে যাবেন?’ – নিজের ভেতর থেকে আরেক খুশবু ওর কাছে জানতে চায়। উত্তরও সে দেয় মনে মনে, ‘হ্যা! পাল্টালে ক্ষতি কি?’

বাবা ফিরে ওর দিকে তাকান। তাঁর শীর্ণ হাতদুটি দেখে খুশবুর চোখের কোণে বর্ষনের অপেক্ষায় ‘ওয়েটিং লিস্টে’ থাকা অশ্রুদের উঁকিঝুঁকি চলতে থাকে। হৃদয়াকাশে ইতোমধ্যে আষাঢ়ের প্রচণ্ড ঘনঘটা… একটু পরেই নামবে প্রবল বেগে।
এই ঝড়ের উৎপত্তি আজ থেকে পনের বছর আগে। মা তখনো বেঁচে। চমৎকার পারিবারিক আবহে খুশবুকে ঘিরে বাবা-মায়ের আনন্দঘন মুহুর্ত! বাবা-খুশবু-খুশবু-মা-বাবা-মা-খুশবু এভাবেই জীবনের চাকা ঘুরতে ঘুরতে একদিন এক বিষণ্ন বিকেলে উপনীত হয়েছিল। একজন পুরুষকে কেন্দ্র করে একটি বিকাল তমসাচ্ছন্ন রাতে যে কখন পরিণত হয়েছিল, আজও সেটা অনুভব করা হলো না ওর।
মা কিংবা বাবা কি অনুভব করেছিলেন? শিহাব কি অনুভব করেছিল?

অনেক সময় এমন হয় না যে, কোনো কারণ ছাড়াই একজন মানুষ আরেক জন মানুষকে অপছন্দ করে ফেলে। শিহাবের বেলায়ও তাই হয়েছিল। বাবা কেন জানি প্রথম দেখাতেই ওকে পছন্দ করলেন না। কেন করলেন না, সেটা তখনো যেমন খুশবু বাবাকে জিজ্ঞেস করে নাই, বিয়ের পরেও জানতে চায় নাই। কেবল নিজের মনের গোপন গভীরে কষ্টের ফল্গুধারা বয়ে গেছে… যাচ্ছে…যাবেও যতদিন বেঁচে থাকবে?

মা বাবাকে অনেক বুঝিয়েছিলেন। ওদের সম্পর্কটা মেনে নিতে যত কিছু করা দরকার করেছিলেন। কিন্তু বাবা মানলেন-ই না। বুঝতে শেখার পর থেকে সব যা চেয়েছে, বাবা সব পূরণ করেছেন। সেই বাবা জীবনের সব চেয়ে আকাংক্ষিত জিনিসটি চাইবার বেলায় বেঁকে বসলেন? একটা জেদের বশবর্তী হয়ে খুশবুও শিহাবের হাত ধরে ঘর ছেড়েছিলো। ভালোবাসা একপলক দু’জন পুরুষকে কেন্দ্র করে ঘুরপাক খেয়েছিল পনের বছর আগের এমনই এক বিষণ্ন বিকেলে। ভালোবাসা জীবনের অতীত অধ্যায় ভুলে বর্তমানের সুখস্মৃতির মোহে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তায় পা বাড়াতেও দ্বিধা করেনি। সেই থেকে বাবা কখনোই ওর আর শিহাবের বাসায় যাননি। এখনো পর্যন্ত শিহাবকে এই পনের বছরে একবারও দেখা দেন নাই। দুই নাতীদের সাথে একান্ত নিজের ভূবনে দেখা করেছেন.. একা একা। মা চলে যাবার পরে আক্ষরিক অর্থেই নিঃসঙ্গতা বাবাকে ঘিরে ফেলে। একজন অসামাজিক মানুষ আরো চরম অসামাজিকতার নিগড়ে নিজেকে আবদ্ধ করে ফেলেন।

‘একটা কথা জিজ্ঞেস করি মা?’
বাবার প্রশ্নে খুশবুর ভূত-ভবিষ্যৎ একাকার হয়ে বর্তমানে ঠাই পায়। সে বাবার চোখে তাকিয়ে কোমল স্বরে বলে,
-হ্যা! করো।
‘ তুই তোর নামের শেষে আমার নাম রাখতে চাইতিস না সেই যখন বুঝতে শিখেছিলিস তখন থেকে। নিজের মত হবার এক প্রবল ইচ্ছে তোর ভেতর দেখে আমি একটুও কষ্ট পাইনি। এখন বল আমাকে, সেই ছেলেটাকে বিয়ে করে ওর নাম তোর নামের শেষে লাগিয়ে তুই কতটুকু নিজের হতে পেরেছিস?’

বাবার এই প্রশ্নে খুশবুর ভেতর-বাহির ওলটপালট হতে থাকে। এক আদিগন্ত অনুভূতি কোথা থেকে সৃষ্টি হয়ে কোথায় কোথায় যেন ছুটে বেড়ায়… নিজের ভেতরে এক দমবদ্ধ অনুভব.. বাইরেও অসার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ক্রমশঃ আরো বিবশ হতে থাকে। ওর সামনে থেকে কেবিন নাম্বার ৩২১ বিস্মৃত হয়। বর্তমান হারায় অতীতের বুকে। সেই বিয়ের পরে ধীরে ধীরে ভালোবাসার বাসি বকুলের মত সুবাস হারাতে থাকা.. ভালোলাগাদের ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে হতে নির্বোধ অনুভবে কেবলি শরীর আঁকড়ে ধরার প্রবণতায় মেয়ে উঠা.. সময়ের কখনো অসময় কখনো দু’সময়ে রুপ নেয়া.. বাবাকে ঘিরে ওর আর শিহাবের ভেতরকার অদৃশ্য চাপা ক্ষোভের স্ফুলিঙ্গের ক্ষণে ক্ষনে জ্বলে উঠা.. আবার শরীরের অন্য জ্বলনে তাঁর প্রশমন.. এভাবে ভালোলাগারা আসলে ভালোবাসায় পুড়ে পুড়ে প্রেমে রুপ নিতে পারে নাই আদৌ! অথচ এই প্রেমের অদৃশ্য স্ফুলিঙ্গের তাড়নায় অমর হতে চেয়েছিল খুশবু। তাই বাবার হাত ছেড়ে পলকেই শিহাবের হাত ধরেছিল।
কিন্তু শিহাব তাঁর নামের শেষ অংশ ধার দিলেও একজন খুশবু হিসেবে কি তাকে মেনে নিয়েছে আদৌ? ঘর-সংসার পছন্দ-অপছন্দ সম্পর্কগুলির ভেতরের দেখা-অদেখা টানাপোড়ন একজন বাঙালি নারীকে কতটা নিজেকে তাঁর নিজের মত করে হয়ে উঠতে দেয়? অণুক্ষণ এই সামাজিক ব্যবস্থা নারীকে কেবল অপরের মনোভাবে আজন্ম নতজানু হবার শিক্ষাই-ই কি দিয়ে চলে না?

কেমন হবে যদি বাবা শিহাবকে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে বলেন? কি হওয়া উচিৎ শিহাবের উত্তর? বাবাও কি প্রকারন্তরে একজন শিহাব নন? তিনিও কি একজন মেয়েকে নিজের নামের শেষাংশ চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলেন না? তবে বাবা-আর শিহাব আলাদা কোথায়?

জীবনের গল্পের শেষ অণুমুহুর্তে একজন বাবা তাঁর মেয়ের উত্তরের অপেক্ষায় চেয়ে থাকেন। কি উত্তর দেবে মেয়ে? পাঠক কি বলেন? আছে কোনো উত্তর?

এক বিষণ্ন বিকেলে অভিজাত এক হাসপাতালের ‘সাউন্ডপ্রুফ কক্ষে’ একজন বাবার হাত ধরে এক মেয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। ওর চোখের জলের অবাধ নিঃসরণ একজন বাবার প্রশ্নের উত্তর হয়ে বয়ে যেতে থাকে। বাবা কি অনুভব করেন?

২ টি মন্তব্য : “শেষ অণুগল্প”

  1. আমার বাবা.... 🙁
    গল্প টা পড়ে আমার বাবার কথা মনে পরে গেল।
    আই মিস ইউ আব্বু 🙁
    মানুষ ভালোবাসার জনকে খুঁজে পেলে বাবা মা কে ছেরে চলে জায় ভালোবাসার হাত ধরে। কিন্তু আমার বাবা জদি চাইতে তবে আমি নিরদিধায় ভালোবাসা কে ছেরে বাবার কাছে থেকে জেতাম।
    কিন্তু আমাকে এসবের কিছুই করতে হয়নি, আমার বাবাই আমাকে ছেরে চলে গেল না ফেরার দেশে।
    আমার কল্পনাতেই ছিলনা!!!!

    জবাব দিন
    • মামুন (১৯৮৪-১৯৮৪)

      আপনার বাবা সহ দুই পারের সকল বাবারা ভালো থাকুন।
      আমি দূঃখিত আপনার অনুভবে 'বাবা হারানোর' বেদনা গল্পের সূত্রে জেগে ওঠায়।

      এই অণুগল্পটি আমার খুব প্রিয়। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন লেখার প্ল্যাটফর্মে আমি সুযোগ পেলে এই অণুগল্পটি পোষ্ট করি, নিজে বারবার পড়ি। এই গল্পে একটা বাবু তার নামের সাথে বাবার নাম লাগাতে চায়নি। সে কতটা নিজের নামে নিজের মত হতে পেরেছে, সেটা একজন বাবার অনুভবের বিষয়। বাবারা কি অনুভব করেন? একজন বাবা-ই সেটা বলতে পারবেন।

      অণুভূতি রেখে যাবার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।


      নিজের মনের আনন্দে লিখালিখি করি।

      জবাব দিন

মওন্তব্য করুন : মামুন (১৯৮৪-১৯৮৪)

জবাব দিতে না চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।