ক্যাডেট কলেজের ভিতর-বাহিরঃ প্রসংগ-১
লিখেছেনঃ কালবেলা | সোম, ২৫/০৮/০৮ ৯:০৫ অপরাহ্ন
ক্যাডেট কলেজের অনেক অনেক ভালো দিক যেমন আছে তেমনি আছে কিছু খারাপ দিকও। অনেক অনেক আলোকিত দিকের আড়ালে রয়ে গেছে কিছু ড্র-ব্যাক। এমনই একটি বিষয় নিয়ে আজ কথা বলতে চাইছি।
একদিন বাংলা ক্লাসে স্যার (নাম ভুলে গেছি) কি যেন বোঝাতে যেয়ে পড়ার বাইরে একটু অন্য প্রসংগে চলে গেলেন। প্রসংগটা আস্তে আস্তে ” ক্যাডেট” বিষয়ক আলোচনায় মোড় নিল। এরই এক পর্যায় তিনি বলছিলেনঃ
“ক্যাডেটরা কেমন জান? ক্যাডেট কলেজে ক্যাডেট রা হল রাস্তার পাশে সারি সারি পাতাবাহারের মত।”
এটুকু বলে তিনি থামলেন একটু। ক্লাসের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন - কে বলতে পারবে কেন পাতাবাহারের মত বললাম?
সভাবতই কেউ বলতে পারল না।
এবার স্যার বললেন, পাতাবাহার গাছ গুলোকে কি করা হয় কিছুদিন পর পরই? কাঁচি দিয়ে ছেটে দেয়া হয়। কোন দিক দিয়ে কোন একটি কুষিপাতা একটু বড় হলেই সেটা ছেটে দিয়ে বাকিদের সমান করে দেয়া হয়। কি এবার কিছু বুঝতে পেরেছ? এখানে নিজের মত করে বড় হবার সুযোগ নেই। নিজের মত থাকার সুযোগ নেই।
এবার বোধয় ক্লাস কিছু একটা বুঝতে পারলো।
আজ হঠাৎ ই কথাটা কেন মনে হল, জানিনা।
ক্যাডেট কলেজে কিছু ক্যাডেট দেখতে পেয়েছি যারা ক্যাডেট কলেজে ঠিক মানিয়ে নিতে পারেনি নিজেদেরকে। মানিয়ে নেয়া-না নেয়ার ফলে অনেকেরই অনেক রকম সমস্যা হতে দেখেছি। কেউ প্রকাশ করেছে, কেউ করেনি, কেউ বা করতে পারেনি। প্রকাশ করে কেউ হয়ত ক্লাস এইটে-ই চলে গেছে টাকা-পয়সা দিয়ে, কারো বা প্রকাশ হয়ে পড়েছে বলে হয়ত এস এস সি এর পর চলে যেতে হয়েছে বাধ্যহয়ে, আবার কেউ বা ৬ ছয়টা বছর ধরে চোখের আড়ালে কিছু জল আর বুকে পাথর চেপে নিয়ে পার করে দিয়েছে চুপিচুপি সময়।
কি বলা যায় এই জিনিসটাকে? এটাকে কোন সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত করা যায় কি? নাকি আদৌ কোন সমস্যা না? যদি সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত করা যায়ই, তাহলে সেটা কার সমস্যা? ব্যাক্তিগত, নাকি সামষ্টিক? ক্যাডেটের, নাকি ক্যাডেট কলেজ সিস্টেমের ?
আমারতো মনে হয় এটি একটি মারাত্নক সমস্যা, যা কিনা একটি মেধাবী ছেলেকে সারা জীবনের জন্য অন্ধকারের মধ্যে ঠেলে দিতে পারে। আমি দুঃখিত সবার কাছে , এই যে সবাই কত মজার মজার কথা লিখছে, কত মজার স্মৃতি ক্যাডেট কলেজ কে ঘিরে, কত হাসি-কান্না, কত রোমাঞ্চকর মুহুর্ত এসবের মাঝে “মানিয়ে না নেয়া” টা আবার কি জিনিস? এসব বলে আবার ব্লগের আনন্দময় পরিবেশটাকে নষ্ট করে দিচ্ছি কি না কে জানে। তবুও কাউকে না কাউকে তো বলতেই হয়।
আমাদের ক্লাসে এমন একজন ছিল, যে ক্লাস সেভেনে আসার পরপরই প্রথম যে পরীক্ষাটা হয়, সেই পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিল। নম্র, ভদ্র একটা ছেলে। কারো সাতে নাই, পাঁচে নাই। অথচ কালের স্রোতে ভিতরে ভিতরে সে কখন দুমরে মুচড়ে গেছে কেউ খেয়ালই করেনি। বোধকরি তার সেই নম্রতা, ভদ্রতাই তার কাল হয়েছিল। আর সবার মত সবার সাথে হৈ হুল্লোড় করে মিশে যেতে পারেনি। তার স্বভাবটাই চুপচাপ থাকা। এধরনের মানুষেরা আত্নাভিমানী হয় খুব বেশি। একটু টিজ খেলেই দেখা যায় অনেক বেশি মনখারাপ করে বসে। অনেক অনেক আকাশ-পাতাল ভাবতে বসে যায়। নিজেকে নিয়ে বিব্রতবোধ করতে শুরু করে। সেই মেধাবী ছেলেটির এমন মানসিক বিপর্যয়ের কথা আমরা জানতে পেরেছিলাম এস এস সি পরীক্ষার পর। অবশেষে তার বাবা মা এসে ছেলেকে কলেজ থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যান।
আমাদের এক ব্যাচ সিনিয়র এক ভাইয়া ছিলেন। অনেক বড়লোকের ছেলে বলে জানতাম আমরা। উনি ক্লাস এইটে পরীক্ষায় ভালো করতে পারেননি। আর অনেক অনেক দুষ্ট(কলেজের নিয়ম কানুনের চোখে) ছিলেন। হেন কাজ নাই উনি করতেন না। একসময় কলেজ আউট হয়ে গেলেন।
কলেজ থেকে বের হয়ে আসার পর আমি কাউকে কাউকে দেখেছি কলেজের প্রতি ভয়ংকর অভিমান নিয়ে বেঁচে থাকতে। প্রচন্ড অভিমানে এমন ও হয়েছে যে ক্লাসমেটদের কোন গ্যাদারিং এ পর্যন্ত আসতে মন চাইত না অনেকের। এটা যে ক্লাসমেটদের প্রতি অনুযোগ স্বরুপ তা নয়, বরং যেন এক ধরনের ছোঁয়াচ বেঁচে চলার মত- ক্যাডেট কলেজের গন্ধ বাঁচিয়ে চলার প্রবণতা সেটা। উপরের দুই ধরনের ছেলেদের তুলনায় এই ধরনের ছেলেদের সংখ্যাই বেশি। এবং আশ্চর্যের বিষয় হল একটা ক্লাসের মোট ছাত্র সংখ্যার রেশিও করলে এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেশি। ৫০ জনের একটা ক্লাসে যদি ১০ জনও এরকম হয় তাহলেও আমি মনে করি ব্যাপারটা এলার্মিং।
যাই হোক। এক্সেপশনাল কেইস গুলো আপাতত বাদ থাকুক। কথা বলি তৃতীয় ধরনটা নিয়ে।
কলেজে অনেকের মাঝে থেকেও অনেকেই আসলে ভিতরে ভিতরে রয়ে যায় খুব একা। ইচ্ছা করলেই চলে যাওয়ার উপায় নেই বলে তাদের নীতিটা হয়ে যায় -” রয়ে যাওয়া আর সয়ে যাওয়া”। এই একা হয়ে যাওয়ার সিস্টেম/ ক্রনোলজিক্যাল প্রসিডিওরটা বেশ দৃষ্টি দেবার দাবি রাখে। কলেজে ক্লাস সেভেনে যখন ৫০ কিংবা ৫৫ জন ছেলে প্রথম আসে তখন সে একতাল কাঁদা মাটি। এরপর দিন যায়, সে কলেজের ঘটনা, পরিবেশ ইত্যাদির সাথে থেকে থেকে একটা শেপ নিতে থাকে। হয় সে সবার সাথে মিশে যায় অনায়াসে নতুবা ক্রমাগত সেগরিগেটেড হতে থাকে। ক্রমাগত আলাদা হয়ে যাওয়ার এই প্রসেসটা সম্পন্ন হয় খুব নিরবে-নিভৃতে। কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই। কিছু কিছু ফ্যাক্টর আছে যেগুলো একটা ছেলেকে শেপ দিতে ক্যাটালিস্ট এর কাজ করে। যেমনঃ
১। একাডেমিক রেজাল্টঃ কলেজের সবচেয়ে বড় একটিভিটি হচ্ছে পড়াশুনা। কলেজে লেখাপড়ায় যে ভালো সেই ই রাজা। এখানে ভালো করতে না পারলে সবদিক দিয়েই কষ্ট। একধরনের হীনমন্যতা কাজ করা শুরু করে। ক্লাসমেটদের মধ্যে চার-পাঁচ ধরনের অদৃশ্য স্ট্যাটাস/লেয়ার তৈরী হয়ে যায়। ভালো রেজাল্ট করা পোলাপান গুলো একদিকে, মিডিয়াম গুলো একদিকে, এক্কেবারে খারাপ করা গুলো হয়ত আর এক দিকে। ক্রমে ক্রমে সে নিজেকে নিজের মধ্যে ঢুকিয়ে ফেলতে শুরু করে। ভালো করতে না পারলে স্যার-ম্যাডামরাও তেমন একটা চ্বেনে না ভালো করে। লজ্জার মধ্যে পড়তে হয় সবসময়……। ক্যাডেট কলেজে সামনে দিয়ে হয়ত পিপীলিকাটি পর্যন্ত যেতে দেয়া হয়না কিন্তু ভিতরে ভিতরে যে পিছন দিয়ে হাতি চলে যায় কেউ দেখতেও পায় না। যে ছেলেটি খুব একাডেমিক্সে খুব খারাপ করে চলেছে তার দিকে স্পেশাল ভাবে তাকানোর কে আছে সেখানে? নেই বাবা, নেই মা। নেই এমন কোন আপন কেউ যার কাছে নিজের অপারগতাগুলো অকপটে তুলে ধরা যায়। ………………
( চলবে…?)



















বলতে না বলতেই নতুন ব্লগ। পড়ার আগেই তাই ধন্যবাদ। পড়ে এসে আরেকটা কমেন্ট দিয়ে যাব। 



(পাট নিলাম) 

আগস্ট ২৬, ২০০৮ , ১২:২৫ পূর্বাহ্ন
[জবাব দিন ]